আওয়ামী দুঃশাসন এর পরের অধ্যায় কী ইসলামী উগ্র মৌলবাদ?
পাঠকেরা জানেন আমাদের এই পত্রিকা কোনো দল-মত এর অনুসারী নয়। বরঞ্চ আমরা সত্যের পক্ষে, বাকস্বাধীনতার পক্ষে, শোষিতের পক্ষে। নির্ভীক সাংবাদিকতার পক্ষে। এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আমরা আমাদের সাংবাদিকতা চালিয়ে গিয়েছি স্বৈরাচারী হাসিনার সরকারের বিরূদ্ধে এবং আমাদের চিন্তার সাথে মিল রেখে উন্মোচিত হলো ছাত্রজনতার হাতে হাসিনার পতন। রক্তাক্ত ছিলো, সন্দেহ নেই। কোন বিপ্লব রক্তাক্ত হয়না? ত্যাগহীন বিপ্লব হয়না।
কিন্তু দুঃখের সাথে লক্ষ্য করলাম আওয়ামী দুঃশাসনের পরপরই বাংলাদেশকে তালেবানে পরিণত করবার জন্যে উন্মাদনায় মেতে উঠলো এতদিন দূর্বল মৃগয়া বা ইঁদুরের মতো লুকিয়ে থাকা ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী দলগুলো। তারা ইসলামী শাসন চাই। এই পাঁঠাদের বোঝানো দুষ্কর যে ইসলাম এর সাথে জাতীয়তাবাদ বা গণতন্ত্র ঠিক যায়না। ইসলামী রাষ্ট্র বলে কিছু থাকতে পারেনা। থাকলে ইসলামী উম্মাহ। কয়টি মুসলিম-প্রধাণ রাষ্ট্র ইসলামী উম্মাহ গঠনে আগ্রহী এখন? আমাদের মতে একটিও না।
দূর্ভাগ্যজনকভাবে আওয়ামী পতনের পর থেকে যেভাবে ইসলামী জঙ্গীরা ও উগ্রবাদীরা সরব হয়েছে, নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে, শরীয়া কায়েম করতে চাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করবার প্রয়াসে লিপ্ত, তা-তে ইউনুস সরকার বা ভবিষ্যতের কোনো সরকারের ওপর কিভাবে আস্থা রাখা যায় তা নিশ্চিত নয়। বিএনপির মৌলবাদ-বিরোধী অবস্থান নড়বড়ে মনে হয়। নিশ্চিত নই আমরা এই অবস্থান ক্ষমতা থেকে এতদিন বাইরে থাকা দলটা বজায় রাখতে পারবে। অস্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে ছাত্র-বিপ্লবের অনেক অংশীদারকে দেখা যাচ্ছে ইসলামী উন্মাদনার সাথে শরীক হতে যেটা আশঙ্কার জন্ম দেয়।
অগাস্ট ২০২৪ এর পর থেকে আমরা অনেক মন্তব্য এবং লেখা পেয়েছি উপরোক্ত ইস্যুগুলোতে। সেগুলোর মধ্যে নির্বাচিত অংশগুলোর চুম্বক অংশ তুলে ধরলাম আমরা নিচে –

নির্বাচিত পাঠক মন্তব্য
সাদিয়া আক্তার (২৩, ঢাকা) – আমি আসলে অনেক বেশি চিন্তিত বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে। হিযবুত তাহরির, হরকাতুল জিহাদ, শিবিরের মতো দলগুলো যদি উগ্র মৌলবাদ প্রচার ও প্রসার করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ অপাংক্তেয় হয়ে যাবে বহির্বিশ্বের কাছে। বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেবে নিশ্চিতভাবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থেই ইসলামী উগ্রতাকে দমন করতে হবে। এবং যতক্ষণ না বাংলাদেশ সমকামী, অবিশ্বাসী, হিজরা এদের ব্যাপারে আধুনিকায়ন না হলে পাশ্চাত্যের দেশগুলো মুখ ফিরিয়ে নেবে। বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্যীয় তেল বা খনিজ সম্পদ নেয় যে বাংলাদেশ চাইলেই বহির্বিশ্বকে অগ্রাহ্য করতে পারবে।
মুনায়েম আহমেদ (২৯, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট) –দীর্ঘদিন প্রবাস জীবনের কারণেই কিনা জানিনা তালেবানি ইসলামী শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশে কল্পনা করতে পারিনা। প্রশ্ন উঠবে – আমি নিজে কি সাচ্চা মুসলমান কিনা? শরীয়া আইনব্যবস্থা, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা না চাইলে যদি আমাকে অমুসলিম গণ্য করা হয়, তাহলে তা-ই সই।
গাজী মোহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম (২৭, উজান চর, কুমিল্লা) – বিশ্বের উন্নত দেশ যুক্তরাজ্য সহ বিভিন্ন দেশে এই সম্পকামী, উভকামী সম্প্রদায়ের অধিকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। সেখানে এই সম্প্রদায় নিজেদের পূর্ণ স্বাধীনতা উপভোগ করেন। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে এধরণের গোষ্ঠীগুলোর উপর চড়াও হয় বিবিধ অন্যায় আইনের সুযোগ নিয়ে। ফৌজদারী দন্ডবিধির এবং অন্যান্য আইনের প্রাসঙ্গিক ধারাগুলো বাতিলযোগ্য বিবেচনা করা উচিৎ বাংলাদেশকে মধ্যযুগীয় সমাজ-ব্যবস্থা হতে বেরুতে হলে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকার রাজু ভাস্কর্যের নারীর মাথায় কালো হিজাব পড়িয়ে দিতেও দেখা গেছে মৌলবাদী সম্প্রদায়কে। দেশের প্রতিটি ভাস্কর্যের সাথে জড়িয়ে আছে সংগ্রামী ইতিহাস ও ঐতিহ্য। কিন্তু গত ৫ই আগস্টে সরকার পতনের পর ছাত্র আন্দোলনে থাকা দুই সমন্বয়ক সারজিস আলম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহকে দেখা গিয়েছে আগ্রাসী ভূমিকায়। দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, ঐতিহ্য জড়িয়ে থাকা সকল ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে তাদের নেতৃত্বে। বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও কৃষ্টির নিদর্শন দেয়াল চিত্রগুলো ও শিল্পকলা পুরোপুরি ভাবে নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা এই ছাত্র সমন্বয়করা ধর্মীয় উগ্রবাদীদের মতোই পন্থা বেছে নিয়েছে। যে কোন ধরণের সমালোচনা এবং বিরোধী মত দমনে রাষ্ট্রীয় শক্তির ব্যবহার করছে বা ঝাঁপিয়ে পড়ছে বিরোধী মতামতধারীদের ওপর, যা একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে অন্তরায়।
এমডি জাকির হোসাইন (৩২, অঙ্গারিয়া, শরীয়তপুর) – বাংলাদেশ এক আজব দেশ। এখানে রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত ডুবে থাকে আকন্ঠ দূর্নীতিতে, এখানে অপরাধ যেন এক স্বাভাবিক বিষয়। খুন, ধর্ষন, রাহাজানি। একে অপরকে কষ্ট দেয়া, সীমাহীন অন্যায় এখান এওতি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে এই বাংলাদেশে সমকামিতা যেন এক অপরাধ।সমকামিতা কেন অপরাধ? কেন ভালোবাসা অপরাধ এই বাংলাদেশে, এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয়ত সম্ভবপর নয় এখানে। তবে ধর্ম বিষয়ক বিধি নিষেধ যে এটিতে প্রচ্ছন্ন ভূমিকা রাখে তা বলা বাহুল্য।এই দেশে আর কিছু পারুক কিংবা না পারুক, চুরি-চামারী করার পর যেভাবে আল্লাহ-খোদার নাম নিতে থাকে যেন চুরি করবার পর এই আল্লাহর নাম নিলেই সব খুন মাফ। সারাদিন চুরি করবে, সারাদিন খুন করবে, ধর্ষন করবে এবং ঘরের মধ্যে মক্কার ছবি রাখলেই যেন অপরাধ থেকে মুক্তি। এইসব ছদ্মবেশী খুনী-ধর্নবাজরাই যেন আজকে এক একটা বাংলাদেশের উদাহরণ হয়ে রয়েছে। ৫ই অগাস্টের পর যে তেলাপোকার মতো ইসলামিস্টদের উত্থান, তাতে এই দেশের পিছনে হাঁটতে হাঁটতে মধ্যযুগে চলে যাওয়া ছাঁড়া গতি নেই।
মোহাম্মাদ শামীম আল মামুন (৪৭, ঢাকা) – এই জঙ্গীবাদী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করতে হবে বা তাদের নিষিদ্ধ স্ট্যাটাস বজায় রাখতে হবে। ফৌজদারী দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিল করতে হবে অবিলম্বে। সমকামী/নাস্তিক/উভকামী এদের সবাইকে বাকিদের সাথে সমানভাবে দেখতে হবে। ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়, রাষ্ট্রীয় নয়। আমরা ভারত, ইরান, আফগানিস্তান চাইনা। উদারনৈতিক বাংলাদেশ চাই। এই চাওয়াতে যদি আমাকে বাজে মুসলমান বলেন তথাকথিত মৌলবাদীরা, তাতেই সই।
বোগদাদ পিয়ারী রুবি (৪৫, কুমিল্লা) – পাশ্চাত্যে জুয়া খেলায় এবং পতিতা ব্যবহারে কারা সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন জানেন? মুসলমানেরা। ফিলিস্তিন এর শিশুর জন্যে কান্না কিন্তু জায়নিস্টদের স্বার্থ উদ্ধারে রত কারা জানেন? মুসলমানেরা। সুদ এর সবচেয়ে বড় ভোগী? মুসলমানেরা। যা কিছু গুনাহ, কবিরা গুনাহ, সেগুলোতে মিলেমিশে একাকার আমার মুসলমান ভাই-এরা। মদ্যপান, নারী নির্যাতন, কোনো কিছুতেই পিঁছিয়ে নেই আমার মুসলমান ভাই-এরা। মুসলমান মেয়েরা নাইটক্লাবে বোরকা খুলে উদ্দাম নৃত্যে ব্যস্ত। সেই নৃত্যে তাল দিতে থাকা মুসলমান পুরুষ বাসায় পর্দানশীন স্ত্রীর শরীয়তী আইনকানুন মানা নিয়ে চিন্তিত।কিন্তু, আপনি সমকামী হলে, নাস্তিক হলে, হিন্দু হলে, আপনার কোনো মাফ নেই। মুসলমানদের চোখে আপনি জঘন্য। অধম।শরীয়া বাংলাদেশে স্বাগতম। মৌলানা ইউনুসের দেশে সংখ্যালঘুদের স্থান নেই।
এমডি মিজানুর রাহমান (৪১, দিনাজপুর) – ইসলামী উগ্রবাদের সাথে সাথে যে ভারত বিদ্বেষ চলমান, তা কিন্তু আমাদের জন্যে খুবই আশংকাজনক। এই উগ্রবাদীদের আস্ফালনের কারণে ভারত যদি বাংলাদেশে তার নিজের নিরাপত্তার কারণে হস্তঃক্ষেপ করতে বাধ্য হয়, তাহলে ইসলামী উগ্রবাদকে সমর্থনদানকারীদের-ও আস্ফালন বন্ধ হয়ে যাবে। ইসলামী মৌলবাদকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থেই রুখে দিতে হবে। সেটার জন্যে যদি এইসব ইসলামীক দলগুলোকে ব্যান করতে হয়, তাহলে সেটাই করা উচিৎ।
জুবায়ের আহমেদ (৩৮, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট) – গত ৫ মাসের ঘটনায় আমার ইসলামিক মূল্যবোধে আঘাত এসেছে বারবার। বাংলাদেশের ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি যেভাবে শিবির, হিযবুত তাহরীর, হরকাতুল জিহাদ এর মতো দলগুল দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমি হতবাক হয়ে গেছি। ইসলামের নামে, ইসলামী শাসন কায়েমের নামে সংখ্যালঘু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের ওপর যেভাবে হামলা হচ্ছে, এটা লজ্জাজনক। আমিও সমকামীদের ঘৃণা করতাম, নাস্তিকদের অবৈধ ভাবতাম। কিন্তু এখন বুঝি ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় উন্মাদনা ধ্বংস ছাঁড়া কিছু ডেকে আনেনা।
ফাতেহা তাসবি (৩০,রমনা, ঢাকা) – এসব মৌলবাদী বিস্তার নিয়ে চিন্তিত নয় তথাকথিত ‘বিপ্লবী’ ছাত্রনেতারা। ধর্মীয় মৌলবাদ বিস্তারের এমন সুযোগ মৌলবাদীরা হাতছাড়া করতে চাইবে কেন? দফায় দফায় ভারতকে হুঁশিয়ারি। আমেরিকা, ট্রাম্প সবাইকে চোখ রাঙানো। ‘কারো দরকার নাই, আল্লা সাথে থাকলেই চলবে!’ হুমকির সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে ইতিহাসও পড়ান। বলেন, ভারতের ইতিহাস নাকি মুসলিমরা আসার পরেই শুরু। হিন্দু হচ্ছে নুহ নবীর ছেলে হিন্দের বংশ। হিন্দ থেকে হিন্দু! এরপরে সব বাদ দিয়ে মুসলিমদের আগমনের গল্প। মাঝে সব বাদ। মুসলিমদের পরে ইংরেজ শাসনের গল্প শুরু। সেই ইতিহাসের কোনও মা-বাপ নেই! বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গাঁ-গঞ্জের মানুষ জেনে গিয়েছে, আওয়ামি লিগকে গালি দিতে হবে এখন। ভারতকে গালি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে। আর এটাই ইউনুস সরকারের জমানা— যে জমানায় শুধু শেখ হাসিনা, আওয়ামি লীগ আর ভারতকে গালি দিলে সাত খুন মাফ। তা সে চরম মৌলবাদী হোক কিংবা জঙ্গি হোক।
মুহাম্মাদ জাকির হোসাইন (৪৫, পঞ্চকাঠি, শরীয়তপুর) – ধর্ম যে একটা ব্যক্তিগত বিষয় এবং মারামারি, যুদ্ধ, হানাহানির বিষয় নয়, সেটা বুঝতে আমার সময় লেগেছে অনেক। ধর্মান্ধ এক দেশে জন্ম, স্বাভাবিকভাবেই এইসব গোঁড়ামি থেকে বেরুতে কয়েক দশক লেগে যায়। তার ওপর হুমায়ুন আজাদ, অভিজিত রায় সহ প্রমুখের হত্যা এবং আক্রমণের শিকার হওয়া চোখ এড়াইনি। এরা সবাই ধর্মান্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সমালোচক ছিলেন। কেউ কট্টর কঠিন ছিলেন সমালোচনায়, কেউ একটু মিষ্টি। কিন্তু পরিণতি উগ্র জনগোষ্ঠীর কাছে বেঘোরে প্রাণ দেয়া বা আহত হওয়া।
শাহরিয়ার এমডি নাফিস খান (৩৬, মালিবাগ, ঢাকা) – আওয়ামী লীগ দুঃশাসনের বিরূদ্ধে যেভাবে আমাদের ছাত্র জনতা এবং আপামর জনসাধারণ জেগে উঠেছিলেন, সেটা আমাদের মতো যারা মুক্তিযুদ্ধের স্বাদ পাননি, তাদের জন্যে নতুন এক বিজয় এর চেতনা নিয়ে এসেছিলো। বাংলাদেশ, মনে হয়েছিলো, অবশেষে মুক্ত হলো শেখ পরিবারের অভিশপ্ত দখলদারিত্ব থেকে।কিন্তু বিধি বাম! হরকাতুল জিহাদ, হিজবুত তাহরীর, শিবির, যে উগ্র ইসলামী মৌলবাদী দলগুলো এতবছর লুকিয়ে ছিলো, যাদের বিষাক্ত থাবা থেকে বাংলাদেশ মুক্ত ছিল গত দেড় দশক, যাদের হিংস্রতার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম আওয়ামী-পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা ইসলামী দলগুলোর দৌরাত্মে, তাদের যে সাম্প্রতিক আবির্ভাব, তা বাংলাদেশ নিয়ে সমস্ত আশা ভরসাকে গুড়িঁয়ে দেবার জন্যে যথেষ্ঠ।সমস্ত ভাষ্কর্য, দেয়ালচিত্র, চিত্রকর্মকে যেভাবে অবমাননা করা হচ্ছে মনে হচ্ছে ১৯৭১ হয়নি, মনে হচ্ছে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ভুলে যাওয়াটা প্রচন্ড দরকার এই ইসলামী উগ্রবাদীদের জন্যে। যেভাবে মহিলাদের ইরান/আফগানিস্তান ধরণে হেনস্থা করা হচ্ছে, এটা আতঙ্ক-জাগানিয়া। সমকামীদের অধিকার ও নাস্তিক/অবিশ্বাসীদের বাক-স্বাধীনতার জন্যে যে লড়াই, মনে হচ্ছে আমরা আরো ১০০ বছর পিছিয়ে গেলাম এই উগ্র হায়েনাদের কবলে পড়ে। বিএনপির মৌন অবস্থান এক্ষেত্রে ন্যাক্কারজনক।
আবুবক্কর সিদ্দীক (২৮, অঙ্গারিয়া, শরিয়তপুর) – আমরা কিছুটা ভয়ের সাথে এটি লিখছি। দেখুন, আমরা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম/চট্টগ্রামের একটি অত্যন্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের সন্তান। আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতেও যথেষ্ট সময় কাটিয়েছি। একটি জিনিস আমরা বাংলাদেশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেশ মিল পেয়েছি। এটি ছিল সকল ধর্মীয় মতবাদ এবং তদসংক্রান্ত অনুশীলনের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য এবং ‘অন্যদের’ বিরুদ্ধে কুসংস্কার এবং ঘৃণার ধীর-স্থির এবং অতীব যত্নশীল লালন-পালন। এখানে ‘অন্যরা’ বলতে সমকামী, ট্রান্সসেক্সুয়াল, উভকামী, নাস্তিক, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং অন্যান্যদের বোঝায়। এই মনোভাব কিন্তু পাকাপোক্তভাবে রয়েছে যে মুসলিমরা অন্য সকলের চেয়ে ভালো এবং এটিই মানব-সভ্যতার শেষ ধর্ম।কী ভয়ঙ্কর আত্মপ্রেমী বিভ্রম! এই বিভ্রম থেকে বেরুতে না পারলে মুসলমানিত্ব কুলাঙ্গারিত্বে পরিণত হবে।
এমডি সাব্বির হোসাইন (৩৪, অলংকারপুর, রাজবাড়ী) – পশ্চিমা দুনিয়ায় যে উন্মুক্ত বাকস্বাধীনতার উপস্থিতি তার প্রেক্ষাপটে বলতে হয় – বাংলাদেশী এবং মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ এবং সাধারণভাবে মুসলিমরা কতটা বিভ্রান্ত তা দেখে ঠিক থাকা কঠিন। উপরোক্ত শ্রেণীগুলির (সমকামী, নাস্তিক, উভকামী) প্রতি তাদের গভীরে প্রোথিত ঘৃণা এবং কুসংস্কার এতটাই দৃঢ় যে মুসলমানেরা এই মনোভাবগুলিকে তাদের সাথে আমৃত্যু কবরে পর্যন্ত নিয়ে যায়। ৫ আগস্ট ২০২৪ সাল থেকে, বাংলাদেশ যে উগ্রবাদ প্রত্যক্ষ করেছে তা ইরান, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের উগ্রবাদের মতোই। এই ব্যার্থ রাষ্ট্রগুলোর বৈশিষ্ট্যগুলো ধরা পড়ে – আপনি যতই যুক্তিসঙ্গত এবং ন্যায়সঙ্গত হোন না কেন, আপনি ইসলাম সম্পর্কিত কোনও কিছুর বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবেন না। আমাদের নিজস্ব পরিবারে এটি দেখেছি। আশা করি ইসলামী উগ্রবাদের কুসংস্কার থেকে মুক্ত একটি উন্নত বাংলাদেশ, একটি উন্নত মধ্যপ্রাচ্যের আবির্ভাব ঘটবে।
মিজানুর রহমান (৪৯, বাঘা, রাজশাহী) – আওয়ামী লীগ এর পতনে আমি উল্লসিত ছিলাম, কিন্তু ইসলামের নামে দুঃশাসন, ঘৃণা মেনে নেয়া যায়না। নাস্তিক, সমকামী, সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেকোনো মূল্যে। এইসব জঙ্গীবাদীদের কোনো স্থান নেই বাংলাদেশে। ০৫ অগাস্ট ২০২৪ পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এটি নিশ্চিত করে দেখিয়ে দিয়েছে – আওয়ামী শাসনামলে হয়তো অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি ছিল, দুর্নীতি হয়তো যদ্দূর সীমিত বা দূরীভূত করা দরকার ছিল, তা-তে সরকার ব্যার্থ হয়েছিল, কিন্তু ইসলামী উগ্রবাদ তথা জঙ্গীবাদ দমনে আওয়ামী লীগ যে মারাত্মকভাবে সফল ছিলো, তার প্রমাণ গত ছয় মাস তুলে ধরেছে। এইসব ইসলামী দলগুলো যে আসলে বাংলাদেশ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, তা-র প্রমাণ কিন্তু এখন এন্তার। ছাত্র ছদ্মবেশী ইসলামী জঙ্গীরা ইরান চায়, আফগানিস্তান চায়, ইসলামী শাসনব্যবস্থা চায় মধ্যযুগীয় প্রেরণায়। বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস – শিল্পকলা, ভাষ্কর্য, চিত্রশিল্প গুঁড়িয়ে দিয়েছে এরা ইসলামের নামে।
মহিউদ্দীন মিয়া (২৫, বোয়ালমারী বাজার, বোয়ালমারী, ফরিদপুর) – ইউনুস এর সরকার ইসলা্মি উগ্রবাদকে গ্রহণ করেছে বলেই মনে হচ্ছে। ধর্মের ভূমিকা রাষ্ট্র থেকে কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ইউনুস সরকারকে এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে মৌলবাদী ছাত্রনেতাদের বাদ দিয়ে হলেও।
এমডি মানওয়ার হুসাইন (২৭, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি) – আসলে এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে আওয়ামী সরকার পতনের পর বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদ বা উগ্র ইসলামী জঙ্গীবাদ বেশ খারাপের দিকে মোঁড় নিয়েছে। আমার মতো যারা নির্ভার বোধ করেছে আওয়ামী ফ্যাসিজম এর পতনে, তারাও এখন বেশ উদ্বিগ্ন সংখ্যালঘু হতে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর হামলা ও আক্রমণে।
এমডি মাসুম সাজ্জাদ (৩৬, ডোমার, নীলফামারী) – আওয়ামী পতনের পর উগ্র মৌলবাদ মাথাচারা দিয়ে উঠলেও এ-ব্যাপারে কোনো সংশোধনীর বা সংস্কারের কোনো কথা নেই কারো মুখে। অথচ এই জায়গায় দরকার ছিল সবচেয়ে বড়ো সংস্কার।প্রথমতঃ সংবিধান থেকে কোনো ধর্মের প্রাধান্য বাদ দেয়া। এটা খুব গুরূত্বপূর্ণ। কারণ এটা না হলে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু ব্যাপারটা থেকেই যাবে, আর বৈষম্য ও অসন্তোষ থেকেই যাবে। ভারতের মোদীর মতো হওয়া চলবেনা।দ্বিতীয়তঃ, সমকামীতাকে ফৌজদারী দন্ড দেয়ার মতো অপরাধ গণ্য করা যাবেনা। ৩৭৭ এর অবলুপ্তি বা সংস্কার প্রয়োজন। এটা না হলে আবারো রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক রূপ থেকেই যাবে।তৃতীয়তঃ, ধর্মের প্রচার ও প্রসার এমনভাবে করা লাগবে যাতে এটা চাপানো মনে না হয়। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আইন করে নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। নাহলে ইসরায়েল এর মতো দেশে পরিণত হতে হবে।অনেক কট্টরপন্থী হয়তো বেজার হবেন। আমাকে নাস্তিক ঠাউরাবেন। কিন্তু মুসলমানের আধুনিক যুগের সাথে না হাঁটলে তারা হারিয়ে যাবে মহাকালের ভীড়ে।
মোহাম্মাদ আব্দুল কাদের সুমেল (৩৬, ফেনী, চট্টগ্রাম) – বাংলাদেশে সমকামীতা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। ধর্মানুভূতিতের আঘাতের আইন এর মোড়কে ধর্ম নিয়ে কোনো সমালোচনা নিষিদ্ধ। নাস্তিকদের মেরে ফেলা হয়। এ কোন সমাজে আমি ছিলাম?এখন দেখছি উগ্রতম মৌলবাদীদের পুনরুত্থান আওয়ামী পতনের পর। বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ধ্বংশ করবার একক এজেন্ডা নিয়ে যেন শিবির, হরকাতুল জিহাদ, হিযবুত তাহরীরের মতো উগ্র জঙ্গীবাদী সংগঠনগুলোর পুনর্জন্ম হয়েছে। আওয়ামী লীগকে এই ধর্মান্ধ উগ্র দলগুলোকে দমিয়ে রাখার কৃতিত্ব দিতেই হয় যদিও তাদের ফ্যাসিবাদী শাসন সে কৃতিত্বকে ম্লান করে দেয়। ভাস্কর্য ভেঙ্গে দেয়া, শিল্পকলা গুড়িঁয়ে দেয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক। এই সুযোগে এই জঙ্গীবাদী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করতে হবে বা তাদের নিষিদ্ধ স্ট্যাটাস বজায় রাখতে হবে। ফৌজদারী দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিল করতে হবে অবিলম্বে। সমকামী/নাস্তিক/উভকামী এদের সবাইকে বাকিদের সাথে সমানভাবে দেখতে হবে। ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়, রাষ্ট্রীয় নয়। আমরা ভারত, ইরান, আফগানিস্তান চাইনা। উদারনৈতিক বাংলাদেশ চাই। এই চাওয়াতে যদি আমাকে বাজে মুসলমান বলেন তথাকথিত মৌলবাদীরা, তাতেই সই।
