ক্রেডিটখোর ডঃ ইউনুস
এম ডি আব্দুল ওয়াহিদ কিরন, যুক্তরাজ্য
ড. ইউনুসের জীবনের একটি ছোটবেলার গল্প আছে—যা তার আত্মজীবনী “গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন” বইতে তিনি নিজেই লিখেছেন। সেখানে তিনি জানান, কীভাবে তিনি একসময় অন্যের প্রাপ্য কিছু নিজের বুদ্ধির জোরে কৌশলে নিজের করে নিয়েছিলেন। তবে সেটা কোনো অনুতাপের গল্প নয়—বরং তিনি সেটাকে উদ্ভাবনী চিন্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
গল্পটি এমন: সেই সময়ের জনপ্রিয় কিশোর পত্রিকাগুলোতে কুইজ প্রতিযোগিতা হতো। যারা বিজয়ী হতো, তাদের বাসায় ছয় মাসের সৌজন্য সংখ্যা পাঠানো হতো। ড. ইউনুস তখন ভাবলেন—এইভাবে তো বিনা খরচে ম্যাগাজিন পাওয়া যায়। কিন্তু কুইজে অংশ নিয়ে বিজয়ী হবার পরিশ্রমে না গিয়ে, তিনি অন্য পথ বেছে নেন। তিনি বিজয়ীদের নাম-ঠিকানা ম্যাগাজিনে দেখে সেগুলো সংগ্রহ করতেন, তারপর নিজেকে সেই ব্যক্তি পরিচয়ে চিঠি লিখে জানান দিতেন যে তার ঠিকানা পরিবর্তন হয়েছে। এরপর সেই ম্যাগাজিনগুলো চলে আসতো তার ঠিকানায়।
এই কাজ তিনি আত্মজীবনীতে লিখেছেন আত্মতুষ্টির সুরে, যেন এটা তার সৃজনশীলতার প্রমাণ। কিন্তু এখানেই তো প্রশ্ন—ছোট বয়স থেকেই যার চিন্তাভাবনায় অন্যের প্রাপ্য কৌশলে আত্মসাৎ করার প্রবণতা থাকে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে স্বভাব কি বদলায়?
বর্তমানেও সেই পুরনো ধারা?
ড. ইউনুসের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডেও সেই পুরনো ছায়া যেন রয়ে গেছে। যেমন চীনের সফর ঘিরে যে ‘অর্জনের’ প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার বেশিরভাগই আসলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের উদ্যোগ। কিন্তু যেভাবে তা তুলে ধরা হচ্ছে, তাতে মনে হয় সব কিছুই যেন ড. ইউনুসের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব। অথচ একটু খোঁজ করলেই এসব তথ্য পাওয়া যায়—কিন্তু প্রচারণার মোড়ক এতটাই কৌশলী যে সাধারণ পাঠক বিভ্রান্ত হন।
নোবেল পুরস্কারের কথাও এখানে প্রাসঙ্গিক। আমরা সবাই জানি, নোবেল পুরস্কার ড. ইউনুস একা পাননি—গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গেও এই পুরস্কার ভাগাভাগি হয়েছে। কিন্তু দেশে এই বিষয়টি নিয়ে যত প্রচারণা হয়েছে, তাতে মনে হয় যেন একমাত্র তিনিই বিজয়ী। গ্রামীণ ব্যাংকের অবদান কোথাও গুরুত্ব পায়নি। প্রকৃত তথ্য হলো, এই ব্যাংক গড়ে উঠেছিল সরকারি সহায়তায়। তখন ড. ইউনুস ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক—অর্থায়নের উৎস কি তার ব্যক্তিগত ছিল? মোটেও না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি এমনভাবে নিজের পরিচয়ের অংশ বানিয়েছেন, যেন তা একান্তই তার সৃষ্টি।
সহযোগীদের চরিত্র আর মিডিয়া ম্যানিপুলেশন
ড. ইউনুসের আশেপাশের মানুষদের দিকে তাকালেও একই প্রবণতা চোখে পড়ে। যারা তার পিআর পরিচালনা করে, যেমন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ডাস্টবিন শফিক কিংবা অন্যান্য মুখপাত্র—তাদের কথাবার্তা, প্রচারণা, সবই একটা নির্দিষ্ট ‘ছবক’ অনুসরণ করে: মিথ্যাচার, তথ্য বিকৃতি আর একরকম দম্ভ। এই প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে সম্প্রতি প্রচার করা হচ্ছে, নাকি ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নে হয়েছে, মানুষ ড. ইউনুসকে চায়, তিনি একজন ‘স্টেটসম্যান’ হয়ে উঠছেন!
বাস্তবতা হলো—ঈদের ছুটির পরও ঢাকায় জ্যাম লেগে থাকে, কারণ অনেক মানুষ ঢাকাই ছাড়তে পারে না; শ্রমিকরা ঠিকমতো বেতন পান না। অন্যদিকে মিডিয়াতে ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের খবর কম প্রকাশিত হলেও, মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট বলছে সংখ্যাটা বরং বাড়ছে। এসব রিপোর্ট সামাজিক মাধ্যমে না ছড়ালে সাধারণ মানুষ জানতেই পারত না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে, যেমন নিউ ইয়র্ক টাইমসে, মৌলবাদের বিস্তার নিয়েও শঙ্কা প্রকাশিত হচ্ছে—কিন্তু আমাদের দেশের পত্রিকাগুলোতে এসব খবর আসে না।
শেষ কথা
দেশের বাস্তবতা কী, তা বুঝতে পিএইচডি ডিগ্রি লাগে না—চার-পাঁচজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললেই বুঝে যাবে। এই পরিস্থিতিতেই ড. ইউনুসকে ঘিরে ‘মহানত্বের’ নতুন প্রচারণা শুরু হয়েছে। দেশের অবস্থা যদি সত্যিই ভালো থাকতো, তাহলে হঠাৎ করে এত মাস পর তাকে ঘিরে এত আয়োজন লাগত না।
ড. ইউনুসের ব্যক্তিত্ব, তার প্রচারণা আর রাজনৈতিক কৌশল—সব মিলিয়ে যেটা বোঝা যায়, সেটা হলো: একটা আদর্শিক ফাঁপা বেলুনকে দিনদিন বড় করা হচ্ছে, যার ভিতরে কিছুই নেই। আর সেই কাজেই লেগে আছেন তার পিআর বাহিনী—যাদের মূল শক্তি মিথ্যা, কৌশল আর নাটকীয়তা।

