বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের উপর ক্রমাগত হামলা, মামলা ও অত্যাচার: বাস্তবতা, কারণ ও করণীয়
এম ডি লুতফর রহমান, যুক্তরাজ্য
ভূমিকা
দখলদার ইউনুস বাহিনী ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমণ করেই চলেছে। এরই মধ্যে আক্রমণ হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বাসা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকী সহ অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাই। এই রাজাকারদের চরম শিক্ষা দিতে হবে। আর ঘরে বসে থাকা যাবে না।ম
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের ত্যাগ, বীরত্ব এবং আত্মদান ছাড়া আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ কল্পনা করা যেত না। অথচ, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা হামলা, মামলা ও নানা প্রকার মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। এসব ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতার ঘাটতির ইঙ্গিত বহন করে। এই প্রবন্ধে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের উপর ক্রমবর্ধমান হামলা, মামলা ও অত্যাচারের বাস্তব চিত্র, কারণ, প্রভাব এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিশদ আলোচনা করব।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ শহীদ এবং অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। স্বাধীনতার পর তাঁদের মর্যাদা রক্ষার জন্য সরকার বিভিন্ন আইন, ভাতা ও সম্মাননা চালু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, সম্মানী ভাতা, বাসস্থান সুবিধা এবং চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপব্যাখ্যার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের প্রকৃত অবদানকে অস্বীকার করা হয়েছে, আবার অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়ে আসল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সুবিধা কমিয়ে দিয়েছেন।
হামলা, মামলা ও অত্যাচারের সাম্প্রতিক চিত্র
শারীরিক হামলা
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রায়শই মুক্তিযোদ্ধাদের উপর শারীরিক হামলার খবর প্রকাশিত হয়। জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা সামাজিক আধিপত্যের দ্বন্দ্বের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা হামলার শিকার হন। অনেক সময় তাঁদের পরিবারও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
মিথ্যা মামলা
অন্য একটি বড় সমস্যা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা। ভূমি বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। আদালত চত্বরে কিংবা থানায় বারবার হাজিরা দিতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক কষ্ট ও আর্থিক ক্ষতি হয়।
সামাজিক নিপীড়ন
কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিকভাবে বয়কট বা অপমানের শিকার হতে হয়। তাঁরা যেসব এলাকায় সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক ছিলেন, সেসব জায়গায়ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপে তাঁরা নিজ ঘরে নিরাপদ বোধ করেন না।
হামলা ও নিপীড়নের পেছনের কারণ
১. রাজনৈতিক প্রতিহিংসা: রাজনৈতিক বিভাজন ও স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলার অন্যতম কারণ।
২. ভূমি ও সম্পত্তি বিরোধ: মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই জমিজমা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন, যেখানে প্রতিপক্ষরা তাঁদের বয়স ও অসহায়তাকে সুযোগ হিসেবে নেয়।
৩. মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অনিয়ম: ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সুবিধায় চাপ সৃষ্টি করে, ফলে ক্ষোভ বাড়ে।
৪. আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা: হামলার ঘটনায় যথাযথ তদন্ত ও দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা সাহস পায়।
৫. সচেতনতার ঘাটতি: তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ, ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান কমে যাচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অত্যাচারের প্রভাব
ব্যক্তিগত পর্যায়ে
হামলা ও মামলার কারণে মুক্তিযোদ্ধারা মানসিক চাপে ভোগেন। বয়সজনিত অসুস্থতার সঙ্গে এসব নিপীড়ন তাঁদের জীবনের শেষ প্রান্তকে দুঃসহ করে তোলে।
পারিবারিক পর্যায়ে
মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারও ভয় ও অনিরাপত্তায় থাকে। সন্তানেরা সামাজিকভাবে অপমানিত হয়, আর্থিক ক্ষতি হয়, এমনকি শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনে বিঘ্ন ঘটে।
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে
মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলা বা নিপীড়ন কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধের অবমাননা। এর ফলে সমাজে স্বাধীনতার চেতনা দুর্বল হয় এবং তরুণদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আগ্রহ কমে যায়।
আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ
সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সুরক্ষায় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন:
- মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে অগ্রাধিকার দেওয়া।
- হামলা বা মামলার ঘটনায় আইনগত সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ।
- মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা।
তবে এসব উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না। স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতি মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায়বিচার পেতে বাধাগ্রস্ত করে।
সমস্যার সমাধানে করণীয়
আইনি পদক্ষেপ
- মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে।
- হামলার ঘটনায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনিক ও সামাজিক উদ্যোগ
- স্থানীয় প্রশাসনকে মুক্তিযোদ্ধাদের সুরক্ষায় আরও সক্রিয় হতে হবে।
- মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে সমাজে তাঁদের মর্যাদা পুনঃস্থাপন করা জরুরি।
- মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হেল্পলাইন বা দ্রুত সহায়তা সেল চালু করা যেতে পারে।
শিক্ষাক্ষেত্রে উদ্যোগ
- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে আরও বিস্তৃতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
- স্কুল-কলেজে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা অনুষ্ঠান আয়োজন করলে তরুণরা তাঁদের অবদান সম্পর্কে জানতে পারবে।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা
গণমাধ্যম মুক্তিযোদ্ধাদের উপর হামলা বা মামলার ঘটনা প্রকাশ্যে আনে, যা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নাগরিক সমাজ, এনজিও ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের আইনি ও মানসিক সহায়তা দিতে পারে।
উপসংহার
মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। তাঁদের ত্যাগের প্রতিদান হামলা, মামলা বা অপমান হতে পারে না। রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব তাঁদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অত্যাচার বন্ধে কার্যকর আইন, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং জনসচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
মুক্তিযোদ্ধাদের সুরক্ষা মানে কেবল কিছু মানুষের নিরাপত্তা নয়; এটি স্বাধীনতার অর্জনকে সংরক্ষণের শপথ। তাই আজই প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ, যাতে দেশের প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা শান্তি, মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনের শেষ প্রান্ত অতিক্রম করতে পারেন।

