গণপিটুনি ও এই মব থামবে কবে?
নিশাত জাহিন রুপান্তি
রংপুরের তারাগঞ্জ হাটের জুতাপট্টিতে চকির ওপর বসে জুতা সেলাই করছে এক কিশোর— নাম তার জয় দাস। বয়স মাত্র ১৪। এই বয়সে হাতে থাকার কথা বই-খাতা, শোনার কথা ক্লাসের ঘণ্টাধ্বনি। অথচ তার হাতে আজ সুতো-সুঁই, কারণ বাবাকে হারিয়েছে সে গণপিটুনির নামে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডে।
গত ৯ আগস্ট ‘ভ্যান চোর সন্দেহে’ উত্তেজিত জনতা তার বাবা রূপলাল দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে। সেই রাতেই প্রাণ যায় তার জামাই প্রদীপ দাসেরও। রূপলালই ছিলেন পাঁচ সদস্যের পরিবারের একমাত্র ভরসা। বাবার মৃত্যুতে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে সংসার।
আজ তাই দাদি, মা আর দুই বোনের ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে তুলেছে নবম শ্রেণির এই কিশোর। স্কুলে যাওয়া থেমে গেছে। স্বপ্নগুলো মলিন হয়ে গেছে। জয় বলে—
“বাবা বেঁচে থাকলে এত দ্রুত আমাকে সংসারের হাল ধরতে হতো না। পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার ইচ্ছে ছিল। এখন জানি না, সে ইচ্ছে পূরণ হবে কি না।”
হাটের মানুষজন বলে, রূপলাল ছিলেন এক সহজ-সরল মানুষ, কোনো দ্বন্দ্বে জড়াননি কখনো। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতকারী তার জীবন কেড়ে নিল ভ্যানচুরির মিথ্যা অভিযোগে। আর আজ তার ছেলের চোখে স্কুলের স্বপ্ন নিভে গেছে, জায়গা নিয়েছে অকালপ্রাপ্তবয়স্ক দায়িত্ব।
জয়ের মা মালতি রানী বুক ফেটে বলেন—
“উপার্জন করার মতো সংসারে আর কোনো পুরুষ নেই। ছেলেটাই এখন আমাদের একমাত্র ভরসা। যাদের কারণে আমার স্বামী মারা গেল, তারা আমাদের সুখ-শান্তি চিরদিনের জন্য কেড়ে নিল।”
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়— পুরো সমাজের জন্য এক ভয়ংকর আঘাত। একজন নিরীহ মানুষকে সন্দেহের বশে পিটিয়ে হত্যা, একটি পরিবারকে নিঃস্ব করা— এ দায় কি কেবল তাদের? নাকি আমাদের নীরব সমাজও সমান দায়ী?
একটি প্রশ্ন রেখে যায় জয় দাসের জীবনের গল্প— ইউনুসের এই খুনে সরকারের আমলে গণপিটুনি ও এই মব থামবে কবে? একটি শিশুর শৈশব কি আরেকটি বারের মতো বইয়ের পাতায় ফিরবে? নাকি আমাদের নিষ্ঠুর নীরবতা আরও অসংখ্য জয়কে বই ছেড়ে সুতো-সুঁই হাতে বসতে বাধ্য করবে?

