BangladeshOpinion

ইউনুস সরকারের “নীতির মুখোশ” আর উপদেষ্টাদের করিডর-দুর্নীতি: রাষ্ট্রযন্ত্র যখন ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ হারায়

এম ডি সামিউল আলম, যুক্তরাজ্য থেকে

বাংলাদেশে নতুন ক্ষমতা মানেই নতুন আশা—এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন একটি দেশ দীর্ঘ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, প্রাতিষ্ঠানিক ভয়ের সংস্কৃতি এবং কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনিক আচরণের মধ্যে দিয়ে এসেছে, তখন মানুষ নতুন শাসনের কাছে অন্তত তিনটি জিনিস চায়: স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ রাখা। কিন্তু ইউনুস সরকারের সময়কালে যা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, তা হলো—রাষ্ট্র আবার সেই পুরনো ফর্মুলায় ফিরে যাচ্ছে: নীতির কথা বলা, কিন্তু বাস্তবে ব্যবস্থাপনার অন্ধকার গলি খোলা রাখা।

এই সরকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা দুর্নীতি “আছে কি নেই” সেই প্রশ্ন নয়; বরং সমস্যা হলো—দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ ওঠার পরও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়ার ভাষা হয়ে যাচ্ছে দ্ব্যর্থক, প্রতিরক্ষামূলক, এবং অনেক ক্ষেত্রে সময় ক্ষেপণের কৌশল। ফলে সাধারণ মানুষ বুঝে ফেলে—কথা যতই বড় হোক, “জবাবদিহি” বলতে যা বোঝায়, তা আসলে ক্ষমতার শীর্ষে গিয়ে আটকে যাচ্ছে।

১) “অভিযান” না “নির্বাচিত নীরবতা”—দুর্নীতি দমন কমিশন যখন নিজেই রাজনৈতিক বাতাসে দুলে

যখন দুর্নীতির অভিযোগে সরকার ঘনিষ্ঠ কেউ জড়ায়, তখন রাষ্ট্র যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হয়, তবে তদন্ত হবে দ্রুত, প্রকাশ্যভাবে, এবং ফলাফল হবে দৃশ্যমান। কিন্তু বাংলাদেশে বহু দশক ধরে একটি বিপজ্জনক অভ্যাস তৈরি হয়েছে: ক্ষুদ্র লোককে ধরা, বড় লোককে ছাড় দেওয়া; অথবা বড় লোকের আশপাশের কয়েকজনকে বলি দিয়ে মূল কাঠামোটা অক্ষত রাখা। এখন ইউনুস শাসনেও সেই একই প্রবণতার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে, গণমাধ্যমে এসেছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ স্টাফদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে এন্টি-করাপশন কমিশন (ACC) তদন্ত শুরু করেছে, যেখানে অভিযোগের ধরন ছিল প্রভাব খাটিয়ে বদলি, নিয়োগ, লবিং ইত্যাদি। এই খবরটি শুধু রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি নয়—এগুলো রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্নীতির পরিচিত “ক্লাসিক” প্যাটার্ন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এখানে কি শুধু দু-একজন স্টাফ “খারাপ”, নাকি সিস্টেমটাই এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে স্টাফরা ‘দরজা’ আর ক্ষমতাবানরা ‘চাবি’?

এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে দুর্নীতিবিরোধী কথাবার্তা শুধু বক্তৃতা হয়ে থাকে। কারণ—বদলি-বাণিজ্য, নিয়োগ-বাণিজ্য, প্রকল্পে কমিশন—এগুলো বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং বহু বছর ধরে রাষ্ট্রীয় শাসন মডেলের ভিতরের লেনদেন।

২) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়—বাংলাদেশের “স্বর্ণখনি”—এখানে যে অভিযোগ ওঠে, তা সাধারণ অভিযোগ নয়

প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ঐতিহাসিকভাবে বড় বাজেট ও প্রকল্পের কারণে রাজনৈতিক সুবিধা ও অনিয়মের বড় ক্ষেত্র—এবং সেখানে প্রকল্প দুর্নীতিকে দলীয় ফান্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগও ওঠে। এই জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় সরকার কাঠামো হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় “ডেভেলপমেন্ট পাইপলাইন”—রাস্তা, ড্রেন, ব্রিজ, স্কুল, ছোট-বড় নির্মাণ—সবকিছু। এই পাইপলাইনে যদি জবাবদিহি না থাকে, দুর্নীতির স্রোত শুধু টাকায় সীমিত থাকে না; সেটি দলীয় ক্যাডার, ঠিকাদার সিন্ডিকেট, প্রশাসনিক স্বার্থ—সবকিছুকে একসঙ্গে শক্তিশালী করে।

ফলে যখন এই সরকারের উপদেষ্টা-ঘনিষ্ঠ কাঠামো নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তখন রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া “আমরা দেখছি” বা “খতিয়ে দেখা হচ্ছে”—এ ধরনের ভাষা নয়; বরং দরকার হয় প্রাতিষ্ঠানিক কঠোরতা।

৩) দুর্নীতি শুধু টাকা নয়—এটা ক্ষমতার নৈতিক সংকট

দুর্নীতি নিয়ে বড় ভুল ধারণা আছে—অনেকে ভাবে এটা শুধু ঘুষ। বাস্তবে দুর্নীতি হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা নীতির ওপর নয়, সম্পর্কের ওপর চলে। এবং সম্পর্ক যখন রাষ্ট্র চালায়, তখন নাগরিক অধিকার “দয়া” হয়ে যায়।

এখানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (যুক্তরাজ্য) পরিষ্কারভাবে বলেছে—ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতি দমন ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে অঙ্গীকার করেছে এবং যুক্তরাজ্যও এ বিষয়ে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এটা আশাব্যঞ্জক কথাও বটে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি চাপও তৈরি করে: অঙ্গীকার করা মানে ফল দেখানো। আর ফল মানে শুধু “পূর্ববর্তী সরকারকে অভিযুক্ত করা” নয়—ফল মানে বর্তমান ক্ষমতায় থাকা লোকদের ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠছে, সেগুলোতেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা।

৪) “আমরা নিরপেক্ষ”—এই বাক্যটি তখনই মূল্যবান, যখন সেটার প্রমাণ থাকে

অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠছে—বিশেষ করে উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়ে। সংবাদমাধ্যমে এসেছে যে নির্বাচন সামনে রেখে সরকার চাপের মুখে, এবং উপদেষ্টাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হতে চায়, তবে তাকে দুই কাজ করতে হয়:
১) প্রশাসনে নিয়োগ/বদলিতে ন্যূনতম স্বচ্ছতা
২) “সুশাসন”কে পার্টি-রাজনীতির বাইরে প্রমাণ করা

কিন্তু যখন বাস্তবে দেখা যায়—দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানগুলো গতি হারায়, কিংবা সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় অদ্ভুত ইউ-টার্ন হয়, তখন জনমনে সন্দেহ তৈরি হয় যে রাষ্ট্র নিজস্ব সংকট ঢাকতে “নীতির ভাষা” ব্যবহার করছে।

৫) মানবাধিকার, গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা—দুর্নীতির সঙ্গে এগুলো অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত

দুর্নীতি বাড়লে প্রথম যে জিনিসটি ভেঙে পড়ে তা হলো আইনের শাসন। কারণ দুর্নীতি মানে নিয়মকে অর্থ দিয়ে ভাঙা।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা-ব্যবহার ও নির্যাতনের সংস্কৃতি আগের মতোই রয়ে গেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এই পরিবেশে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—এটা বিচারহীনতার ধারাকে আরও শক্তিশালী করা।

৬) উপসংহার: “নোবেল” রাষ্ট্র চালায় না—রাষ্ট্র চালায় নিয়ম, জবাবদিহি, ভয়হীন প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশের মানুষ ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থা চায়। ব্যক্তি যতই সম্মানিত হোক, রাষ্ট্রযন্ত্র যদি স্বচ্ছ না হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়—মানুষ আবার বিশ্বাস হারায়। আর বিশ্বাস হারালে দেশ আবার সেই পুরনো খাদে পড়ে:

  • ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানে নিরাপত্তা
  • ক্ষমতার বাইরে থাকা মানে ঝুঁকি
  • প্রশ্ন করা মানে শাস্তি

এই সরকার যদি সত্যিই ভিন্ন হতে চায়, তবে দুর্নীতি নিয়ে তার আচরণ হতে হবে দ্বিমুখী নয়—একই মানদণ্ডে চলতে হবে। নিজেদের লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও সেই একই কঠোরতা দেখাতে হবে। না হলে “সুশাসন” কেবল একটি ব্র্যান্ডিং হয়ে থাকবে—রাষ্ট্রের বাস্তবতা নয়।