মাদ্রাসার বোমা বিষ্ফোরণ
মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন, যুক্তরাজ্য থেকে
কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসা নামে একটা মাদ্রাসা চলছিল একটা একতলা বিল্ডিংএ। মুফতি হারুন নামে একজন মৌলানা সাহেব বাড়িটি ভাড়া নিয়ে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তিন বছর আগে। গোটা পঞ্চাশের ছাত্র ছিল মাদ্রাসাটায়। মুফতি সাহেব মাদ্রাসাটা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাঁর শালা আলামিন আর আলামিনের স্ত্রী আসিয়াকে। আলামিন আর আসিয়া ওদের দুই বাচ্চা নিয়ে একটা রুমে থাকতো, বাকি তিনটা রুম ব্যবহৃত হতো ছাত্রদের ক্লাসরুম হিসাবে। গতকাল সেই মাদ্রাসায় বড়সড় একটা বিস্ফোরণ ঘটে।
বিস্ফোরণের বিল্ডিঙের ভিতরের ও বাইরের দেয়াল ভেঙে ধ্বসে পড়েছে কয়েকটা, কয়েকটা দেয়াল ফেটে গেছে, বিম ও ছাদ ফেটে গেছে, জানালা ফানালা তো কি অবস্থা হয়েছে অনুমান করতে পারেন। পাশের একটা বাড়ীর দেয়ালও ফেটে গেছে, আশেপাশের কয়েক বাড়ীর জানালার কাঁচ চুরমার হয়ে গেছে। ভাগ্যিস ছাত্ররা কেউ মাদ্রাসায় ছিল না শুক্রবা বলে, ছাত্ররা থাকলে যে কি অবস্থা হতো ভাবতেই হাত পা আথান্দা হয়ে আসে।। আলামিন আর ওর স্ত্রী আর ওদের দুই শিশু সন্তান আহত হয়েছে গুরুতরভাবে, ওদেরকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ওদের অবস্থা কি হাল জানিনা।
বিস্ফোরণের পর স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ এসেছে। ঘতনাস্তলে এসে পুলিশের তো চোখ ছানাবড়া। ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে ককটেল, নানারকম রাসায়নিক পদার্থ ও বোমা তৈরির নানারকম সরঞ্জাম। বাড়ীর মালিক বলেছেন তিনি ট মুফতি হাউরঙ্কে মাদ্রাসা চালানোর জন্যে বাড়ী ভাড়া দিয়েছেন, এর মধ্যে যে বোমা তৈরির কারখানা তৈরি করেছিল ওরা সেটাতো তিনি জানতেন না। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট কাজ করছে। এখনো অভিযান চলছে। ককটেল, দাহ্য পদার্থ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযান শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।
দেশের বিরাজমান অবস্থার আলোকে ঘটনাটা দেখেন। এটা তো একটা দুশ্চিন্তা জাগানোর মত ঘটনা। একজন মুফতি সাহেব মাদ্রাসা চালাবেন সেটা তো বোধগম্য, কিন্তু মাদ্রাসার মধ্যে বোমা তৈরির কারখানা কেন? কারা ব্যবহার করছিল এই কারখানায় তৈরি বোমা? বা কাদের জন্যে তৈরি হচ্ছিল এইসব বোমা। এগুলি যে বিনোদনের জন্যে ব্যবহার করার পটকা বোমা বা প্রায় হার্মলেস জর্দার কৌটা নয়। বিল্ডিঙের ছাদ দেয়ায় ও বিম ভেঙে ফেলতে পারে এরকম বিস্ফোরক। এগুলি দিয়ে তো বড় ধরণের নাশকতা করা যেতো। মুফতি সাহেব কাদের জন্যে এই বোমা বানাচ্ছিলেন?
গত বছরের পাঁচই আগস্টের পর বেশ কিছু চেনাজানা সন্ত্রাসী সংগঠনের লোকজনকে জেলখানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলি সবই ছিল ইসলামী সন্ত্রাসী। একটা জেলখানা থেকে আবার কিছু সন্ত্রাসী কারারক্ষীদের অস্ত্র লুট করে পালিয়েছে। অনেকগুলি থানার অস্ত্রশস্ত্র লুট হয়েছে। এখন আবার দেখা যাচ্ছে যে মুফতি সাহেবেড় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে বোমা তৈরির কারখানা। আমাদের সাদা চোখে তো একটাই শঙ্কা জাগে- ইসলামপন্থী যে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলি আছে, ওড়া কোন বড় ধরনের নাশকতা বা তারচেয়ে বড় কিছু প্লান করছে না তো?
এখন তো আরেক মুশকিল হয়েছে। কেরানীগঞ্জের এই মাদ্রাসার মুফতি হারুন ধরণের লোকজনকে গ্রেফতার করতেও পুলিশকে ভাবতে হচ্ছে। ডেইলি স্টার আর প্রথম আলো ভবনে যারা আগুন দিয়েছে সেরকম সন্দেহভাজন লোকদের পুলিশ গ্রেফতার করার পর একদল মৌলানা সাহেব গর্জে উঠেছেন। দাঁড়ি টুপিওয়ালা আলেম সাহেবদের গ্রেফতার করা যাবে না। কি মুশকিল! আমরা টেলিভিশনে আর নানা ভিডিওতে দেখলাম যারা আগুন জ্বালাচ্ছে ওদের মধ্যে তো অনেক দাঁড়িটুপিওয়ালা আছে। দাঁড়ি টুপি থাকলে কি কেউ আইনের ঊর্ধ্বে?
আমি শঙ্কিত। শঙ্কিত আমার দেশকে নিয়ে, দেশের মানুষদের নিয়ে। এমনিতেই নানা ছুতায় লোকজনকে ধরে মারধোর করা হচ্ছে নানা ছুতায়। বিল্ডিং ভাঙা হচ্ছে, আগুন জ্বালানো হচ্ছে নানা জায়গায়। এইসব অপরাধের জন্যে পুলিশ সাধারণত কাউকে ধরেও না- ডেইলি স্টার আর প্রথম আলোতে আগুন লাগানোর আগে কোন ভবন ভাঙা বা আগুন দেওয়ার জন্যে কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে? আমি তো মনে করতে পারছি না। এখন যদি বাজারে এইরকম বোমার সরবারয়াহ হতে থাকে, তাইলে কি হবে? কে ওদেরকে নিয়ন্ত্রণ করবে? কে বাঁচাবে মানুষকে?
কে জানে, হয়তো ইতোমধ্যে অনেক বোমা চলে এসেছে সন্ত্রাসীদের হাতে। কেরানীগঞ্জের এই মাদ্রাসাটাই কি একমাত্র বোমা বানানোর কারখানা ছিল? আর কোথাও কি এইরকম বোমা তৈরির বন্দোবস্ত আছে? কিভাবে জানবো? আতঙ্কিত হওয়া কি অস্বাভাবিক? আপনারাই বলুন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি একটা কিছু বলবে?

