BangladeshNewsOpinionUncategorized

৭-ই নভেম্বর ছিলো এক মিথ্যে গৌরবের গল্প

জাহিদ আহমাদ, যুক্তরাজ্য

৭-ই নভেম্বর কিসের সিপাহী আর জনতার বিপ্লব? এই তারিখটা ঘিরে জিয়াকে কারা মহান করে অলংকার বসায় এবং কেন বসায় এই পুরো ঘটনাটি কোনোদিন আমার মাথায় ঢুকেনি এবং ভবিষ্যতে ঢুকবে বলে মনেও হয়না।

একজন ঠান্ডা মাথার শীতল রক্তের খুনী ও বেঈমান ব্যাক্তিকে বোধকরি এই বাংলাতেই এমন করে গৌরবান্বিত করে তোলা যায়।

Lawrence Lifschultz তাঁর ‘Bangladesh: The Unfinished Revolution’ গ্রন্থের ৮ নাম্বার পাতায় পরিষ্কার করে লিখেছেন ৩ নভেম্বর রাতে জেনারেল জিয়া যখন বুঝতে পারে জেনারেল খালেদ মোশাররফ জিয়াকে ঘিরে ফেলেছে ঠিক তখন পাগলের মত হয়ে জিয়া তাহেরকে ফোন করে এবং তাঁর কাছে সাহায্য চায় বাঁচানোর জন্য।

লিফশুলজের ভাষায়-

‘Zia awoke in his quarters, he made an urgent and desperate call to the outskirts of Dacca. The man on the other end was Abu Taher, once a close personal friend and battlefield comrade from 11th Sector. Zia reportedly appealed to Taher to do something. This time Zia’s own life was at risk. The conversation was never completed for the line was cut.’ [Bangladesh: The Unfinished Revolution’, Page-8, Para 3]

মানে দাঁড়ায় জেনারেল খালেদের ব্রিগেডের কাছে জিম্মি হবার পর-পরি জিয়া তাহেরের কাছে প্রাণ ভিক্ষার জন্য আবেদন জানায় এবং দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি তাহের জিয়াকে বাঁচাতে উদভ্রান্তের মত সমস্ত চেষ্টাই করে।

লিফশুলজ আবার বলেন-

There were to be ‘two prongs’ to the uprising. On the evening of November 6th, at a meeting chaired by Taher which included representatives from every military unit in the capital, final instructions were issued for the first stage of the revolt. Simultaneously orders went out to others cantonments around the country. In the First Prong Major General Zia was to be rescued from detention, and if at all possible, Brigadier Khaled Musharraf and his associates were to be captured alive. [Bangladesh: The Unfinished Revolution’, Page-9, Para 2]

লেখকের ভাষ্যে ব্যাপারটা একেবারেই পরিষ্কার যে এই বন্দিদশা থেকে যিয়া তাহেরকে ফোন দেয় আর তাহের-ই বাঁচাতে চলে আসে জিয়াকে। তাহের সমস্ত পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনার দুইটি দিকও বিবেচনায় রাখা হয়।

জিয়া এই দেশের প্রেসিডেন্ট হবার সমস্ত বাসনা বুকে পুষে রেখেছিলো বহু আগেই। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের সমস্ত পরিকল্পনা জানার পরেও তার চুপ করে থাকা ছিলো নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার সর্বশেষ সিঁড়িতে পা রাখবার প্রাথমিক পদক্ষেপ।

জিয়ার এই বাসনার কথা আমরা জানতে পারি জিয়ার-ই বন্ধু-কোর্স মেট লেঃ কর্ণেল (অবঃ) এম এ হামিদ পি এস সি সাহেবের গ্রন্থ ‘তিনটি সেনা অভুথ্যান ও কিছু না বলা কথা’-তে।

লেঃ কর্ণেল হামিদ বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনী রশিদের সাথে সাক্ষাৎকারের উদ্বৃতি দিয়ে তাঁর ঐ বইয়ের ৮৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

‘রশিদ তার সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছে, জিয়া এই সময় সরাসরি দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য একেবারে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। আমি তাকে কত বুঝালাম, স্যার আপনি এখনো অনেক ইয়াঙ। এখন আপনাকে প্রেসিডেন্ট মানাবে না। একটু অপেক্ষা করুন। এখন চীফ আছেন ভালোই আছেন। কিন্তু জিয়া অস্থির’

পরবর্তী সময়ে তাহেরকে হত্যার মধ্যে দিয়ে জিয়াউর রহমান এই দেশের সবচাইতে চৌকশ ও হিংস্র বেঈমান ও খুনী হিসেবে এই দেশের ইতিহাসে নাম লেখাতে সক্ষম হয়।

আপনারা একটিবার চিন্তা করে দেখুন তো যেই জিয়াকে বাঁচাবার জন্য একজন মানুষ, যার একটি পা যুদ্ধে উড়ে গেছে সেই তাহের ছুটে এলেন। বাঁচাবার সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করলেন অথচ জিয়া ছাড়া পেয়ে প্রথম সুযোগেই তাহেরকে জেলবন্দী করে এই পঙ্গু লোকটিকে ফাঁসি দিয়ে দিলেন। কর্ণেল তাহেরের হত্যা ও বিচার প্রশ্নে আদালত তাঁর ঐতিহাসিক রায়ে বলেন-

‘The so-called trial continued for about 17 days, during which they did not know what were the charges that they were implicated with, because they were neither supplied any paper nor were the charges read over to them. They did not have the slightest idea as to the evidence that were to be adduced against them.

All the accused, including the petitioner no. 1, were used to be brought in the so-called court room in the Central Jail, handcuffed and barefooted and were all put inside a barbed cage as if they were roman slaves.

Neither them nor the lawyers appearing for different accused, were ever allowed to cross examine the prosecution witnesses; they were escorted by guards to the court and were hurriedly taken away after their hasty deposition. The accused were not at all aware of the contents of the deposition.

The accused persons were hardly given a chance to say anything in their defence or to repudiate the accusation brought against them or to contradict the deposition of the witnesses or to produce any defence witness. [WRIT PETITION NO. 7236 OF 2010]

উপরের প্যারাগুলোর সার সংক্ষেপ হচ্ছে। মাত্র ১৭ দিনের একটা দ্রুত ট্রায়াল হয় যেখানে অভিযুক্তরা কোনোদিন জানতেই পারেনি তাঁদের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ। তাঁরা সামান্যতমভাবে জানতেও পারেন নি তাঁদের বিরুদ্ধে কি তথ্য-উপাত্ত এই আর্মি আদালতে সাবমিট করা হয়েছে।

রোমান দাসদের মত হ্যান্ডকাফ পরিয়ে তাহেরকে আদালতে হাজির করা হোতো, অভিযুকতদের আইনজীবিরা বাদী পক্ষকে কোনো জেরাই করতে পারেনি কিংবা সুযোগটাই রাখা হয়নি।

অভিযুক্তরা তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে একটি কথাও নিজেদের পক্ষে বলতে পারেনি বা বলবার সুযোগ দেয়া হয়নি। এই ছিলো ৭-ই নভেম্বরে তাহেরের উদ্যোগে জিয়াকে বাঁচাবার পুরষ্কার। যিনি জীবন বাঁচালেন, তাঁকে ফাঁসি দিয়ে তার লাশটাই ছিলো তাহেরের পরিবারের কাছে জিয়ার একমাত্র উপহার।

কিন্তু ইতিহাস কি ক্ষমা করেছে জিয়াকে? ইতিহাস কি এই চৌকশ, মিথ্যেবাদী ও নিঁখুত খুনিকে ক্ষমা করে দিয়েছে? উত্তর হচ্ছে দেয়নি।

জিয়ার সতীর্থরাই জিয়াকে চট্রগ্রামে ব্রাশফায়ার করে মেরে মেরে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে। এমনভাবে মেরেছে যাতে এই লাশের চেহারা দেখে কেউ না চিনতে পারে। এমনকি মৃত্যুর পর তারই সতীর্থরা পার্বত্য চট্রগ্রামের এক অচিন পাহাড়ে তার লাশটিকে মাটিচাপা দিয়েছিলো। এই ছিলো এই চৌকশ খুনীর পরিণাম।

৭-ই নভেম্বর যদি তাৎপর্যপূর্ণ হতেই হয় তবে সেটি হোক সমস্ত শোক ও বিলাপ নিয়ে। সেটি হোক সমস্ত দুঃখ নিয়ে কেননা এই ৭-ই নভেম্বর আর তার আগে পরের দিনগুলোতে খুন হতে হয়েছে দেশের অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।

আসুন ৭ ই নভেম্বর আমরা পালন করি দুঃখ নিয়ে, শোক নিয়ে এবং ঘৃণা ভ’রে প্রত্যাখান করি জাতীয়তাবাদী নামের কট্টর আদর্শকে। যেই আদর্শের নামে খুন করা হয়েছে আমাদের হাজার হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।