রোহিঙ্গাদের নিয়ে ডঃ ইউনুসের রাজনীতি
এম ডি আব্দুল ওয়াহিদ কিরন, যুক্তরাজ্য থেকে
ড. ইউনুসের সাম্প্রতিক স্ট্যান্ডবাজি হলো তার রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে সঙ্গে নিয়ে রমজানে টুপি মাথায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার করে তিনি একপ্রকার ঘোষণা দিয়ে এসেছেন—পরবর্তী ঈদের আগেই রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাবে। যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির সামান্য ধারণাও রাখে, তারা বুঝেছিল—এটা নিছকই এক ধরনের প্রতীকী কৌশল, বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনও সম্পর্ক নেই।
তবুও ড. ইউনুসের পিআর টিম, ডাস্টবিন শফিকের নেতৃত্বে, এটিকে ‘বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি’ হিসেবে প্রচার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় বিমসটেক সম্মেলনের পর খবর রটলো যে, মিয়ানমার নাকি ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। বলা হলো, রোহিঙ্গা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান মিয়ানমারের ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টারকে এমনভাবে ‘ঝাড়ি’ দিয়েছেন যে তারা আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে। এরপর সেই খলিলুরই হলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
তাহলে প্রশ্ন হলো—যেখানে স্পষ্টভাবে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়, সেখানে এমন প্রপাগান্ডা চালিয়ে লাভ কী? উত্তর খুব সরল: কারণ তারা জানে, এদেশের জনগণের রাজনৈতিক স্মৃতিশক্তি ক্ষণস্থায়ী। নতুন কিছু শোনার, রঙচঙে খবরের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেশি। সেই ফাঁকেই চলছে পিআর প্রচার—রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে, বিনিয়োগ সম্মেলন হচ্ছে, মানুষ ইউনুসকে চায়—এই সব কনফেকশন খবরে আচ্ছন্ন করে দেওয়া হচ্ছে জনমানসকে।
বৃহৎ প্রেক্ষাপট: রাখাইন, আরাকান আর্মি ও নতুন সংকট
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান অবস্থা আরও ভয়াবহ সংকেত দিচ্ছে। এই অঞ্চল এখন কার্যত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করে আসছে। জাতিসংঘ মহাসচিব ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে ‘সেফ করিডোর’ দিতে অনুরোধ জানিয়েছেন, যার মাধ্যমে সেই এলাকাকে অস্ত্র ও রসদের মাধ্যমে সহায়তা করা সম্ভব হবে।
কিন্তু সমস্যা হলো—রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সম্পর্ক বন্ধুসুলভ নয়। বরং তারা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে আগ্রহী নয়। বিগত ছয় মাসে দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে—যা বাংলাদেশি মূলধারার সংবাদমাধ্যমে উঠে আসেইনি। এমন প্রেক্ষাপটে রাখাইন যদি নতুন রাষ্ট্রও হয়, রোহিঙ্গা সমস্যা সেখানে মিটবে না—বরং ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীরের মতো আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হবে। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গারাও যদি নতুন জাতিগঠনের ঘোষণা দেয়, তাহলে তার দায়ভার কে নেবে?
ব্যক্তিগত অর্জন থেকে রাষ্ট্রীয় প্রভাব
ড. ইউনুস নিঃসন্দেহে একজন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক খেলোয়াড়। তবে তার এই খেলায় জড়িত থাকে অনেকটা ফাঁকি, ছলচাতুরি ও কৌশলী চাল। এসব কৌশলের মাধ্যমেই তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন ‘গ্লোবাল ফিগার’ হিসেবে। কিন্তু এতদিন সেটি ছিল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। এখন যখন তিনি ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রে প্রবেশ করতে চাচ্ছেন, তখন তার সিদ্ধান্ত ও প্রচারণা সরাসরি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের উপর প্রভাব ফেলছে।
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লোভে আজ তিনি এমন এক পথে হাঁটছেন, যেখানে দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান হুমকির মুখে পড়ছে। তাই সময় থাকতে জনগণের সচেতন হওয়া জরুরি। বিভ্রান্তিকর প্রচারণা নয়—বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

