Law & OrderOpinionSpecial Reportমতামতমুক্তমতরাজনীতি

ইউনুস ঠিক যেভাবে দিনের পর দিন দানব হয়ে উঠলো

নবযুগ বিশেষ রিপোর্ট

জুলাই আন্দোলনের যে আশা ছিলো বাংলাদেশ এক নতুন গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হবে তা যেন ক্রমাগত ম্রিয়মান হয়ে এখন এর কংকাল-ই দেখা যাচ্ছে দেশ জুড়ে। পুরো বাংলাদেশ আজ যেন এক মৃত্যু নগরী। নদীর জলে এখন জেলেরা আর মাছ পান না খুঁজে। তার বদলে পান মানুষের রক্তাক্ত লাশ। প্রধান উপদেষ্টা একজন নোবেলজয়ী মানুষ, তাও আবার শান্তিতে। কিন্তু এই লোকটি গত একটি বছর ধরে শান্তির বদলে বাংলাদেশকে বানিয়েছে একটা জীবন্ত নরক এবং তিনিও হয়ে উঠেছেন একজন দানব। বিচার বিভাগের প্রত্যেকটি ধাপ, সেটি হয় নিম্ন আদালত কিংবা উচ্চ আদালত সব খানেই যেন চোরের মেলা আর দূর্নীতিবাজের মেলা। শত শত আইনজীবিদের জামিন হয়না, তাঁরা ধুকে মরছে কারাগারে। ইউনুস ইসলামের নামে সন্ত্রাসীদের জেল থেকে মুক্ত করে এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে আর স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ যেন এক ইসলামিক রিপাবলিক হয়ে এই দেশটিকে পাকিস্তানের মত একটি ব্যার্থ রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হতে থাকে। পুরো দেশ মবে আক্রান্ত। কিছু হলেই একদল লোক একত্রিত হয়ে বাড়ীঘর ভাংচুর, দোকান, অফিস, দেশের সমস্ত বিশেষ ভবন থেকে শুরু করে পত্রিকা অফিস, বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধ এখন এক কল্পনার শব্দ। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বলে আর কিছুই নেই। সব যেন রাজাকারের আর ইসলামী মৌলবাদের স্বর্গরাজ্য। মোট কথা পুরো দেশটাই ইউনুসের এই দানবীয় শাসনে ইসলামি মৌলবাদের কাছে পরাস্ত। এমন এক বাস্তবতায় ডেইলি নবযুগ এই বিশেষ প্রবন্ধের আয়োজন করেছে যেখানে ডেইলি নবযুগের জনপ্রিয় লেখক-লেখিকারা লিখেছেন তাঁদের প্রিয় বাংলাদেশ নিয়ে। যেই বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের করদ রাজ্য থেকে মুক্ত হয়েছিলো কিন্তু যে বাংলাদেশ ইউনুস দানবের হাতের স্পর্শে আবারো পাকিস্তানের পেটেই ঢুকে যাচ্ছে। চলুন আমরা সেই লেখকদের ভাবনা গুলো একের পর এক এই প্রবন্ধে পড়ে নেই।

জুলাই আন্দোলনের ক্রমাগত ব্যর্থতা: কেন বাংলাদেশ বারবার ভুল পথে হাঁটছে

লিখেছেন- আবু রাহাত মুরশেদ কবীর

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “জুলাই আন্দোলন” নামটি একসময় আশার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা, ন্যায়ের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে এই আন্দোলন একটি সম্ভাব্য টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই আন্দোলন একের পর এক ধাপে ব্যর্থ হয়েছে, এবং সেই ব্যর্থতা শুধু একটি আন্দোলনের পরাজয় নয়; এটি রাষ্ট্রের গভীর কাঠামোগত অসুস্থতার প্রতিফলন। আমরা চোখের সামনে দেখতে পেলাম একজন নোবেল লরিয়েট ইউনুস কিভাবে একটা ভয়ানক দানবে পরিণত হয়ে পুরো দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে নিয়েছে আর কিভাবে ইসলামের মত একটি ধর্মকে ব্যবহার করে দেশে ইসলামি ত্রাসের রাজত্ব ছড়িয়ে দিয়েছে। কেউ কি ভাবতে পেরেছিলো কখনও যে, এই ইউনুস লোকটি এই পরিমানে মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের এই বাংলাদেশের বুকে লেলিয়ে দেবে?

প্রথম ও প্রধান ব্যর্থতা ছিল দিকনির্দেশনার অভাব। জুলাই আন্দোলনের সূচনায় আবেগ, ক্ষোভ এবং ক্ষণিকের ঐক্য থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক রূপরেখা অনুপস্থিত ছিল। আন্দোলনকারীরা কী চান—শুধু সরকার পতন, নাকি রাষ্ট্র সংস্কার—এই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর কখনোই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে আন্দোলনটি খুব দ্রুতই আবেগনির্ভর স্লোগানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের নেতৃত্ব কাঠামো ছিল দুর্বল ও বিভক্ত। একাধিক গোষ্ঠী নিজেদের “মূল নেতৃত্ব” দাবি করলেও বাস্তবে কেউই জনগণের কাছে পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এর ফলে আন্দোলনের ভেতরেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কেউ আন্দোলনকে নির্বাচনের হাতিয়ার বানাতে চেয়েছে, কেউ আবার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বাড়ানোর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছে। এই আত্মকেন্দ্রিকতা আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে ক্ষয় করেছে।

আরেকটি বড় ব্যর্থতা ছিল গ্রাম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগহীনতা। জুলাই আন্দোলন মূলত শহরকেন্দ্রিক রয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা হলেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, মজুর—এই আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হতে পারেনি। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র সহজেই আন্দোলনটিকে “শহুরে এলিটদের ক্ষোভ” হিসেবে চিহ্নিত করে কোণঠাসা করতে পেরেছে।

এই আন্দোলনের ব্যর্থতার পেছনে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, বিদেশি শক্তিগুলো স্থিতিশীলতা চায়—গণতন্ত্র নয়। জুলাই আন্দোলন এই বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া একটি গণআন্দোলন টিকে থাকা কঠিন—এই রাজনৈতিক সত্যকে অস্বীকার করাই ছিল আন্দোলনের অন্যতম ভুল।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, জুলাই আন্দোলনের ব্যর্থতা হতাশা জন্ম দিয়েছে। তরুণ সমাজ, যারা একসময় রাজপথে নেমেছিল, তারা এখন রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এই শূন্যস্থানেই মৌলবাদী ও চরমপন্থী শক্তিগুলো ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ব্যর্থতা কখনোই শূন্যতা তৈরি করে না—সেই শূন্যতা পূরণ করে সবচেয়ে সংগঠিত ও সবচেয়ে আগ্রাসী শক্তি।

জুলাই আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, শুধু ক্ষোভ দিয়ে রাষ্ট্র বদলানো যায় না। প্রয়োজন সংগঠন, আদর্শ, নেতৃত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই শিক্ষা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতের প্রতিটি আন্দোলনও একই পরিণতির শিকার হবে।

বাংলাদেশ আজ যে ভয়াবহ অবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তার সূচনাবিন্দু ছিল এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা। জুলাই আন্দোলন কেবল একটি আন্দোলন নয়—এটি একটি সতর্কবার্তা, যা আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

ইউনুস প্রশাসনের দুর্নীতি: নৈতিকতার মুখোশের আড়ালে ক্ষমতার নগ্ন বাস্তবতা

লিখেছেন- এম ডি লুতফুর রহমান

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিসরে “ইউনুস প্রশাসন” একটি ব্যতিক্রমী নাম হিসেবে উঠে এসেছিল। এটি এমন এক সময়ের ফসল, যখন জনগণ প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেছে। এই প্রশাসন নিজেকে উপস্থাপন করেছিল “নৈতিকতা”, “টেকনোক্র্যাটিক দক্ষতা” এবং “দলনিরপেক্ষতা”-র প্রতীক হিসেবে। অনেকের চোখে এটি ছিল পুরোনো রাজনীতির বিকল্প, একটি ক্লিন ব্রেক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মুখোশ খুলে যেতে শুরু করেছে। আজ প্রশ্ন উঠছে—ইউনুস প্রশাসন কি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত ছিল, নাকি তারা শুধু দুর্নীতির ভাষা বদলেছে?

প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো দুর্নীতির সংজ্ঞা নিয়ে প্রতারণা। ইউনুস প্রশাসন দুর্নীতিকে শুধুমাত্র ঘুষ বা নগদ অর্থ লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখাতে চেয়েছে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে দুর্নীতি শুধু টাকা চুরির নাম নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহির অনুপস্থিতিকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এই বৃহত্তর সংজ্ঞায় বিচার করলে ইউনুস প্রশাসনের অবস্থান মোটেও স্বচ্ছ ছিল না।

এই প্রশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বন্ধ দরজার রাজনীতি। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে সীমিত একটি বৃত্তের মধ্যে, যেখানে সাধারণ জনগণ তো দূরের কথা, এমনকি সংসদ বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিরাও কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। “টেকনোক্র্যাটিক দক্ষতা”-র অজুহাতে গণতান্ত্রিক পরামর্শ প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানো হয়েছে। এই প্রবণতা এক ধরনের এলিট দুর্নীতির জন্ম দিয়েছে—যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জনগণের জন্য নয়, জনগণের ওপর।

স্বজনপ্রীতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রশাসনের বিভিন্ন নিয়োগ ও চুক্তি প্রদানের ক্ষেত্রে। যদিও সরাসরি পারিবারিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলনামূলক কম ছিল, কিন্তু আদর্শিক ও পেশাগত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্ষমতা ভাগাভাগি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু এনজিও, কর্পোরেট গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে বেসরকারি স্বার্থের এই মেলবন্ধন দুর্নীতিরই একটি সূক্ষ্ম কিন্তু ভয়ংকর রূপ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহির অনুপস্থিতি। ইউনুস প্রশাসন নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিল যেন তারা নৈতিকতার ঊর্ধ্বে। সমালোচনাকে তারা প্রায়শই “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে খারিজ করেছে। এর ফলে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়—যেখানে ক্ষমতাসীনরা মনে করতে শুরু করে যে তারা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। গণতন্ত্রে এই মানসিকতা দুর্নীতির সবচেয়ে উর্বর জমি।

আন্তর্জাতিক পরিসরে ইউনুস প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতা ছিল এই দুর্নীতিকে আড়াল করার আরেকটি হাতিয়ার। বিদেশি মিডিয়া ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছে “নৈতিক প্রশাসন”-এর ইমেজ ব্যবহার করে তারা অভ্যন্তরীণ সমালোচনাকে দুর্বল করেছে। কিন্তু এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের ভেতরে দুর্নীতির কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও গভীর হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ইউনুস প্রশাসনের দুর্নীতি নৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। জনগণের একটি অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে “ভালো মানুষ” মানেই “ভালো শাসক”—যা ইতিহাসে বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নৈতিকতা ব্যক্তিগত গুণ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা। ইউনুস প্রশাসন এই মৌলিক সত্যটি উপেক্ষা করেছে।

এই প্রশাসনের ব্যর্থতা শুধু তাদের নিজস্ব নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্যও ভয়ংকর একটি নজির স্থাপন করেছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে “অরাজনৈতিক” দাবি করেও গভীরভাবে রাজনৈতিক ও ক্ষমতালোভী হওয়া সম্ভব। এর ফলে জনগণের মধ্যে একটি চরম হতাশা জন্ম নিয়েছে—যেখানে মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, বিকল্প বলেও আসলে কোনো বিকল্প নেই।

এই হতাশা সরাসরি যুক্ত হয়েছে মৌলবাদের উত্থানের সঙ্গে, যা আমরা পরবর্তী ব্লগে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব। কারণ ইতিহাস বলে, যখন মধ্যপন্থী ও তথাকথিত নৈতিক শক্তিগুলো ব্যর্থ হয়, তখন চরমপন্থার পথ আরও প্রশস্ত হয়।

ইউনুস প্রশাসনের দুর্নীতি আমাদের শেখায় একটি নির্মম সত্য—নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করলেই কেউ দুর্নীতিমুক্ত হয়ে যায় না। বরং সেই ভাষা অনেক সময় দুর্নীতিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। বাংলাদেশ আজ যে ভয়াবহ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এই শিক্ষা উপেক্ষা করার সুযোগ আর নেই।

মৌলবাদের উত্থান ও ইসলামী সন্ত্রাসবাদ: ব্যর্থ গণতন্ত্র, নীরব প্রশাসন এবং ইউনুস প্রশ্ন

লিখেছেন- এম ডি সাব্বির আহমেদ

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় মৌলবাদের উত্থান আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল—যার পেছনে রয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা, রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা এবং তথাকথিত “নৈতিক” প্রশাসনের নীরবতা। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ কেবল ধর্মীয় চরমপন্থা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে মাথাচাড়া দেওয়া শক্তি।

এই উত্থানকে বুঝতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে—মৌলবাদ কখনো হঠাৎ জন্ম নেয় না। এটি জন্ম নেয় তখনই, যখন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও প্রতিনিধিত্ব দিতে ব্যর্থ হয়। জুলাই আন্দোলনের ব্যর্থতা, রাজনৈতিক বিকল্পের অভাব এবং ইউনুস প্রশাসনের তথাকথিত নৈতিক শাসন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এমন একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেখানে চরমপন্থী শক্তিগুলো নিজেদের “একটি স্পষ্ট আদর্শের বাহক” হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে।

ইউনুস প্রশাসনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা ছিল মৌলবাদকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে না দেখা। তারা মৌলবাদকে প্রায়শই “সামাজিক বিচ্যুতি” বা “দারিদ্র্যের ফল” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এই সরলীকরণ অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ মৌলবাদ শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি আদর্শিক, সংগঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত একটি আন্দোলন। একে ভুলভাবে চিহ্নিত করলে মোকাবিলাও ভুল হয়।

এখানেই আসে ইসলামী সন্ত্রাসবাদের প্রশ্ন। বাংলাদেশে অতীতে একাধিকবার জঙ্গি হামলা, উগ্রপন্থী সংগঠনের উত্থান এবং আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্থানীয় গোষ্ঠীর সংযোগের অভিযোগ উঠেছে। এই বাস্তবতার পরও ইউনুস প্রশাসনের অবস্থান ছিল আশ্চর্যজনকভাবে নরম ও দ্ব্যর্থক। সমালোচকদের মতে, তারা “স্থিতিশীলতা” ও “ধর্মীয় অনুভূতি”র অজুহাতে কঠোর অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এই নীরবতা কি কেবল রাজনৈতিক কৌশল, নাকি আদর্শিক দুর্বলতা? এই প্রশ্নই আজ সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে। ইউনুস প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কিছু বুদ্ধিজীবী ও সমর্থক দীর্ঘদিন ধরে “ইসলামোফোবিয়া”র অভিযোগ তুলে মৌলবাদের সমালোচনাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। এর ফলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—যেখানে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কথা বললেই সেটিকে ধর্মবিদ্বেষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি: ইসলাম ও ইসলামী সন্ত্রাসবাদ এক নয়। কিন্তু ইউনুস প্রশাসনের সময় এই পার্থক্যটি রাষ্ট্রীয়ভাবে জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়নি। বরং প্রশাসনের নীরবতা মৌলবাদীদের জন্য একটি সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে তারা নিজেদের “ধর্মের রক্ষক” হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে।

সমালোচকরা আরও বলেন, ইউনুস প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত কিছু এনজিও ও সামাজিক সংগঠন অতীতে এমন ব্যক্তিদের বা প্ল্যাটফর্মকে জায়গা দিয়েছে, যাদের বক্তব্য মৌলবাদী চিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। যদিও সরাসরি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ নেই, তবে এই আদর্শিক সহনশীলতাই মৌলবাদের বিস্তারের জন্য যথেষ্ট। রাষ্ট্র যখন স্পষ্ট সীমারেখা টানে না, তখন চরমপন্থা সেই ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে।

ইসলামী সন্ত্রাসবাদ সবসময় বন্দুক বা বোমা দিয়ে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় ভাষা দিয়ে, ন্যারেটিভ দিয়ে, “আমরা বনাম তারা” চিন্তাধারা দিয়ে। ইউনুস প্রশাসনের সময় এই ন্যারেটিভগুলোর বিরুদ্ধে শক্তিশালী পাল্টা ভাষ্য গড়ে তোলা হয়নি। বরং প্রশাসনের অনেক বক্তব্যে একটি আত্মতুষ্টি ছিল—যেন বাংলাদেশ এই বিপদ থেকে মুক্ত। ইতিহাস বলে, এই আত্মতুষ্টিই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো তরুণ সমাজ। যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাস হারিয়েছে, তারা এখন দুটি চরমের একটিতে ঝুঁকছে—সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদাসীনতা অথবা চরম আদর্শিক আশ্রয়। মৌলবাদ এই দ্বিতীয় পথটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে। ইউনুস প্রশাসন এই তরুণদের জন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক বিকল্প হাজির করতে পারেনি।

এখানে প্রশ্ন আসে—ইউনুস প্রশাসন কি ইচ্ছাকৃতভাবে মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে? এর সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তাদের নীরবতা, দ্ব্যর্থকতা এবং সিদ্ধান্তহীনতা মৌলবাদী শক্তিগুলোর জন্য সহায়ক হয়েছে। রাজনীতিতে নীরবতাও একটি অবস্থান—এবং এই অবস্থান অনেক সময় অপরাধের সমান ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ আজ যে ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, সেখানে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ একটি সম্ভাব্য বিস্ফোরক উপাদান। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা বা নৈতিকতার ভাষায় ঢেকে রাখা আত্মঘাতী। ইউনুস প্রশাসনের সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়তো সক্রিয় সহযোগিতা নয়, বরং দায়িত্বশীল বিরোধিতার অনুপস্থিতি

এই ব্লগের উদ্দেশ্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং একটি জরুরি প্রশ্ন তোলা—নৈতিকতার মুখোশ পরে কি মৌলবাদের সঙ্গে সহাবস্থান করা যায়? বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, এর মূল্য চুকাতে হয় অনেক বড়ভাবে।

বাংলাদেশ কি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পথে? অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও নৈতিক অবক্ষয়ের সমান্তরাল সংকট

লিখেছেন- হামজা রহমান অন্তর

“ব্যর্থ রাষ্ট্র” শব্দটি শুনতে যতটা ভয়াবহ, বাস্তবে তার লক্ষণগুলো আরও নীরব ও ধীরে ধীরে হাজির হয়। বাংলাদেশ আজ সেই নীরব বিপদের দিকেই এগোচ্ছে—হঠাৎ করে নয়, বরং ধারাবাহিক অবহেলা, ভুল সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক ভণ্ডামির মাধ্যমে। রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে একদিনে নয়; রাষ্ট্র ভাঙে যখন প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

প্রথম সংকেত আসে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থেকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন—সবগুলোই রাজনৈতিক প্রভাবের নিচে পড়েছে। সন্ত্রাসী, অবৈধ দখলদার ইউনুস প্রশাসনের সময় এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে “নিরপেক্ষ রাখার” নামে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। ফলে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলেও দায়িত্ব বিকেন্দ্রীভূত হয়নি—বরং হারিয়ে গেছে।

অর্থনীতির দিক থেকেও চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, রেমিট্যান্স নির্ভরতা—সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। অথচ এই শ্রেণিই ছিল গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার মেরুদণ্ড। রাষ্ট্র যখন তার মধ্যবিত্তকে রক্ষা করতে পারে না, তখন সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে সামাজিক চুক্তি হারায়।

নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, বরং আকার বদলে ফিরে এসেছে। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো এখন সরাসরি সহিংসতার বদলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দখলের পথে হাঁটছে। রাষ্ট্রের দুর্বলতা তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ।

নৈতিক অবক্ষয় এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। রাজনীতি এখন আদর্শের জায়গা নয়, বরং সুযোগের বাজার। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে কি না—তা ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়, বরং বর্তমানের সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশে গে ও লেসবিয়ান নাগরিকরা: নীরব আতঙ্কের মধ্যে একটি অদৃশ্য জনগোষ্ঠী

লিখেছেন-আফরোজা আলীম আশা

বাংলাদেশে গে ও লেসবিয়ান নাগরিকদের জীবন কোনো দৃশ্যমান যুদ্ধক্ষেত্র নয়—বরং এটি এক ধরনের নীরব বন্দিত্ব। এখানে তারা প্রতিদিন বেঁচে থাকে ভয়, আত্মগোপন এবং সামাজিক বর্জনের মধ্যে। রাষ্ট্র তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করে না, সমাজ তাদের মানুষ হিসেবে মানে না, আর মৌলবাদীরা তাদের “অপরাধী” হিসেবে চিহ্নিত করে।

আইনগতভাবে সমকামিতা এখনো অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এই আইন প্রয়োগ হোক বা না হোক, এর অস্তিত্বই যথেষ্ট—কারণ এটি সমাজকে একটি বৈধ হাতিয়ার দেয় ঘৃণা ও সহিংসতার। ইউনুস প্রশাসনের সময় মানবাধিকার নিয়ে বড় বড় কথা বলা হলেও, LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর বিষয়ে ছিল চরম নীরবতা।

এই নীরবতা কাকতালীয় নয়। কারণ মৌলবাদী শক্তিগুলো এই জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকেই তাদের আদর্শিক শত্রু হিসেবে দেখে। প্রশাসন তাদের ক্ষেপাতে চায়নি। ফলে গে ও লেসবিয়ান নাগরিকদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রীয় এজেন্ডায় জায়গা পায়নি।

এর ফল ভয়াবহ। চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা—সব জায়গায় তারা বৈষম্যের শিকার। অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। যারা পারে না, তারা দুই জীবন বাঁচে—একটি সমাজের সামনে, আরেকটি একান্ত গোপনে।

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা বিচার করা হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের কীভাবে রক্ষা করে। এই মানদণ্ডে বাংলাদেশ আজ গভীরভাবে ব্যর্থ।

বিচারবিভাগের অকার্যকারিতা: যখন ন্যায়বিচার একটি বিলাসপণ্যে পরিণত হয়

লিখেছেন-প্রীতম পাল

বাংলাদেশে বিচারবিভাগ কাগজে-কলমে স্বাধীন, বাস্তবে নয়। আর এই ইসলামী সন্ত্রাসী ইউনুসের আমলে তো নয়ই। আদালত আছে, বিচারক আছেন, আইন আছে—কিন্তু ন্যায়বিচার নেই। এটি কোনো আবেগী অভিযোগ নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা। এখানে ইসলামী জঙ্গীদের সেনাবাহিনী গান স্যালুট দেয় আর নিরীহ মানুষ জেলে পঁচে মরে। গত দেড় বছরে বাংলাদেশে শতশত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে পাকিস্তানী রাজাকারদের প্রভাবে আর কোরান, ইসলাম কিংবা মুহম্মদ নবীর নাম ব্যবহার করে হত্যা ধর্ষন লুটপাটের মত অপঃকর্মের বিষয়ে মামলা নেই এবং রাষ্ট্রেরও নেই মাথা ব্যাথা।আসলে মেটিকুলাস ডিজাইন্ড পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফ্রি ফ্রি ক্ষমতায় এসে শুধু নিজের ট্যাকের টাকা মওকুফই করেছে ইউনুস। দেশ নিয়ে কিংবা দেশের বিচার বিভাগ নিয়ে ভাবার তার সময় কই? চোখের সামনে আমরা দেখেছি হিন্দু কিশোর উতস মন্ডলকে কি অত্যাচারই না করেছে ইউনুসের সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশ বাহিনবী। সেসবের ক্ষেত্রে কি নুন্যতম বিচার বা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিলো? উত্তর হচ্ছে- হয়নি।

মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ক্ষমতাবানরা সহজেই জামিন পায়, দুর্বলরা পায় না। রাজনৈতিক মামলায় রায় হয় পরিস্থিতি অনুযায়ী। এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে পড়েছে।

ইউনুস প্রশাসনের সময় বিচার সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি। কারণ বিচারবিভাগ কার্যকর হলে সবচেয়ে আগে প্রশ্নের মুখে পড়বে ক্ষমতাবানরাই। ফলে অকার্যকারিতাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

বিচার না পেলে মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে বিচার নিতে চায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় সহিংসতা, মৌলবাদ, নৈরাজ্য। বিচারবিভাগের ব্যর্থতা তাই শুধু আইনি সমস্যা নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তার সংকট।

লালবদরদের দেশে

লিখেছেন মুহম্মদ জাহাঙ্গীর শাহনেওয়াজ চৌধুরী

বাংলাদেশের প্রতিটা রাজনৈতিক দলই কম বেশি দেশের সাধারণ মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আন্ডার এস্টেমেট করে। শুধু রাজনৈতিক দলই না, এদেশের তথাকথিত সুশীল বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, এলিট ইন্টেলেকচুয়াল ক্লাস- এরা মনে করে বৃদ্ধিবৃত্তি, রুচি ও চিন্তায় তারা সবার চেয়ে আলাদা এবং এই রুচি, চিন্তা ও বৃদ্ধিবৃত্তি সাধারণ মানুষের নাই।

যেহেতু সাধারণ মানুষের বেশিরভাগই গরীব বা মধ্যবিত্ত, যেহেতু তাদের চেহারায় জৌলুশ কম, ইংরেজি বলতে পারে না, খেটে খায় এবং রাস্তায় ফুটপাত ধরে হাঁটে ও ঘামে; ফলে এই যে সাধারণ জনগন, এদের বৃদ্ধিবৃত্তিকে অত্যন্ত ছোট করে দেখা হয়, আর সব বুদ্ধির সিন্ডিকেট নিয়ে বসে থাকে ওই সুশীল, ইন্টেলেকচুয়াল এলিট সমাজ এবং রাজনীতিবিদরা। তারা ভাবে লোকজন কম বোঝে, কম জানে, শিক্ষাদীক্ষা নাই, মগজে পুষ্টি নাই- ফলে এদের সহজেই প্রভাবিত করা যায়, যাবে এবং যাচ্ছে। এই প্রভাবিত করার ইচ্ছে এবং করতে পারবে এই মনের জোরের কারণেই মধ্য বামপন্থী থেকে মধ্য ডানপন্থী যেকোনো দল শুধুমাত্র নিজেদের ভোটের হিসেব ঠিক রাখতে মৌলবাদীদের সঙ্গে নানা সময়ে ভাব করে, জোট করে। তারা ভাবে এই হিসেবে জনগনকে ধর্মান্ধ হিসেবে ধরে নিলে হিসাব মেলানো সহজ হবে। তারা ভুলে যায় এই একই হিসেবের ভেতরে জনগনের স্বাভাবিক বুদ্ধি, চেতনা, জানাশোনা, সচেতনতা কিংবা সংস্কৃতির বোধকেও ধরা দরকার ছিল।

মেটিকুলাস ডিজাইনে ইউনুস গংও দেশের মানুষকে আন্ডার এস্টিমেট করেছে। ডিজাইনের প্রথম ধাপে এই জিনিস করে তারা পার পেয়েছে, কারণ পুরো আন্দোলনটাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে, রাস্তায় গুপ্ত ঘা*ত*ক দিয়ে হ*ত্যা করে, সেটি আবার শ্যুট করে সেই সোশ্যাল মিডিয়াতেই ছড়িয়ে দিয়ে, সমস্ত গণমাধ্যমকে ষড়যন্ত্রের অংশীদার করে বা অংশীদার হতে বাধ্য করে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, পেইড বা আনপেইড ফেবুকেন্দ্রীক চো*দনাগুলোকে কাজেও লাগিয়েছে নিখুঁতভাবে, যাতে কেউ সামান্য প্রতিবাদ করলে বা বিপক্ষে কথা বললেই ভারচুয়াল মব করে তাদের তারা থামিয়ে দেয়।

পুরো কাজটা রীতিমতো ঠান্ডা মাথায় বসে দীর্ঘ দিনের প্ল্যানের ফসল। এখানে জনগনকে ধরেই নেওয়া হয়েছে অশিক্ষিত, চেতনাহীন, মূর্খ, ধর্মান্ধ এবং সংস্কৃতি-চিন্তাহীন। তাদের ধারণা ছিল ক্ষমতা দখলের পর মব তৈরি করে, মানুষকে হেনস্থা করে, কষ্ট দিয়ে যে অরাজকতার রাজ্য তারা তৈরি করবে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে, মানুষ সবকিছুর উপরে সেই ভয়কেই ভয় পাবে; মানুষের আর কোনো বোধ কাজ করবে না, ফলে দেশের ২০ কোটি মানুষ অতি সহজেই তাদের ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করবে এবং তারা খুব দ্রুত তাদের বহুল আকাঙিক্ষত রাষ্ট্রকাঠামো এবং শাসনব্যবস্থা কায়েম করে ফেলবে।

জুলাই ষড়যন্ত্র সাকসেসফুল হওয়ায় এই মেটিকুলাস ডিজাইনওয়ালাদের আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে গিয়েছিল। সেই সাথে জনগনকে বুদ্ধিহীন, চেতনাহীন, ধর্মান্ধ ভাবার ভাবনাটাতেও আরো জোর এসেছিল। তারা ভেবেছে এভাবেই এই দেশের মানুষকে তারা এদের পর এক বোকা বানিয়ে চলবে আর এক সময় যা যা করবে বলে এত কিছু করেছে, তাই তাই করবে।

তো সে মতই চলছিল। পুলিশকে মে*রে ঝুলিয়ে রাখা দিয়ে শুরু হলো। শিক্ষকদের মব করে অপমান করা হলো। সব ভাঙাভাঙি হলো। মানুষ ভয় পেল। ওদের আত্মবিশ্বাস আরো তুঙ্গে। কিন্তু ওরা ধাক্কা খেল দ্রুত। দেশের মানুষ দ্রুত কথা বলতে শুরু করল। যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভর করে বা*লের জুলাই হলো, সেই সোশ্যাল মিডিয়াতেই ঘুরে দাঁড়ালো অসংখ্য মানুষ। ঘুরে দাঁড়ালো আওয়ামী লীগের অ্যাক্টিভিস্টরাও। এরপর কর্মীরাও। তারপর তারা রাস্তাতেও নেমে আসলো।

এই যে এত মানুষ ঘুরে দাঁড়ালো, প্রতিবাদ করতে শুরু করলো, এবং এত দ্রুত, (বন্যার টাকা মেরে দেওয়ার পর থেকেই লোকে কথা বলতে শুরু করেছে) এটা ওদের চিন্তা বাইরে ছিল। কারণ যে পরিমান, এবং যেভাবে মব হচ্ছিল সব জায়গায়, যেকোনো কারো জন্য পরিস্থিতি প্রচন্ড ঝুঁকির ছিল। তারপরও মানুষ কথা বলল। যে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল ওদের দখলে, সেই সোশ্যাল মিডিয়াতেই লাল বদরগুলো মুহুর্তেই কোনঠাসা হয়ে গেল। কারণ কী? কারণ, ভয় বা আতঙ্ক ছড়িয়ে আপনি বুদ্ধিহীন, চেতনাহীন, সংস্কৃতিহীন, বোধহীন মানুষকে দিনের পর দিন চুপ করিয়ে রাখতে পারবেন। কিন্তু যে জাতি ৭১ এর মতো মুক্তিযুদ্ধের মতো সময়কে পার করে এসেছে, সেই লালন হাসনের বাঙালিকে আপনি যদি তার গরীব গরীব চেহারা দেখে বিচার করে থামিয়ে রাখার প্ল্যান করে থাকেন, ভুলটা আপনার সেইখানেই ছিল। আপনারা মনে হয় ভুলে গেসিলেন যে, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের যে ছবি ও ভিডিও আমরা দেখি, সেখানে লুঙ্গী পরা, খালি গায়ের শুকনো কাঠি রোগা গরীব অশিক্ষিত চাষাভুষাদেরই দেখি, যারা নিজেদের শরীরের চেয়ে বেশি ওজনের অস্ত্র কাঁধে বয়ে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিল।

দেশ একটা বোধ। সংস্কৃতি একটা অভ্যাস। দেশ আমার আত্মবিশ্বাসও। আমার একটা দেশ আছে, পতাকা আছে, জাতীয় সংগীত আছে- এটি জানা এবং সেই জানা থেকে উৎসারিত আত্মবিশ্বাস বুকে ধারণ করার জন্য লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকস থেকে গ্রাজুয়েট হতে হয় না, অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি করা লাগে না। জাস্ট নিজের একটা সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর গর্ব করার মতো জাতীয়তাবাদের ইতিহাস থাকা লাগে।

মানুষ তো গরীবই। কিন্তু গরীব মানেই ছাপড়ি না। ছাপড়ি তো কিছু আছেই। সেই ছাপড়িদেরই আপনারা বেছে বেছে খুঁজে এনে কাজ সেরেছেন। প্রথম কাজটা সারার পর ভেবেছেন বাকি কাজ সহজেই হয়ে যাবে। ওই যে আন্ডার এস্টিমেট করেছেন! মানুষকে! ভেবেছেন সবাই ছাপড়ি। ভেবেছেন সবাই অসৎ। কিন্তু এই হিসাবের জায়গাটায় ভুল হয়েছে। ভুল হয়েছে বলেই দ্বিতীয়, তৃতীয় ধাপে এসে আপনাদের প্ল্যান মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করেছে। মব করেছেন, পুলিশ আর্মিকে নিষ্ক্রিয় করেছেন, মানুষকে আতঙ্কে নীল করেছেন, তবু শেষ অব্দি দ্বিতীয় ধাপটাও ঠিকমতো পার হতে পারেন নাই। এত এত ক্ষমতাধর দেশ আর ক্ষমতাধর আর্মি সাথে থাকার পরও! আর পারবেনও না।

বাংলাদেশের মানুষ খুব অদ্ভুত। কেমন যেন ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত দেখতে, পড়ালেখা ভাল জানে না, স্মার্ট না, শব্দ করে খায়, ম্যানার জানে না! এইসব দেখে ভেবেছিলেন বেছে খুঁজে আনা ছাপড়িদের কাজে লাগিয়ে সবটা উৎরে যাবেন!

হবে না! ওই ক্ষ্যাত, গরীব দেখতে লোকগুলেই দেবে না। সোশ্যাল মিডিয়া তো বটেই, মাঠে ঘাটে হাটে বাজারে ওই ক্ষ্যাত বাঙালিই আপনাদের দফা সাঙ্গ করেছে। আরো করবে। আপনাদের পতন অনিবার্য। পরিনতিও সামনে খুব খারাপ।

বাকি থাকে রাজনৈতিক দল আর এলিট ইন্টেলেকচুয়াল সমাজ!

রাজনৈতিক দল মানুষকে বোকা ভাবে। তাই ২০২৪ এর জুলাই সব রাজনৈতিক দলের জন্য শিক্ষা সফরের বছর। আর ইন্টেলেকচুয়ালদের জন্য একটা ভবিষ্যৎ বাণী করি। একদিন এই মুখোশ পরা বে*জন্মাগুলোকে মানুষ মুখের উপ্রে থু* দিয়ে বলবে, তুই রাজাকার! তুই সুবিধাবাদী! তোরা মিথ্যাবাদী! তোরা ছাগল!

সেই দিন খুব বেশি দূরে না! আর তারা তো আমার আপনার আশেপাশেই থাকে, চলে ফেরে – তাই না?

ইউনুস প্রশাসনের সময় ইসলামী মৌলবাদের বিস্তার ও দুর্নীতি: নীরব প্রশ্রয় থেকে প্রকাশ্য নৈরাজ্য

লিখেছেন- সৈয়দা ফারহানা ফাহমিদা

বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি বহু বছরের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় দ্ব্যর্থকতার ফল। তবে সাম্প্রতিক সময়ের যে অধ্যায়টি সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তা হলো ইউনুস প্রশাসনের সময়কাল। এই সময়টিকে অনেকেই “নৈতিকতার শাসন” বলে বর্ণনা করতে চাইলেও বাস্তবতা বলছে—এই সময়েই মৌলবাদ আরও সংগঠিত, আরও আত্মবিশ্বাসী এবং আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।

ইউনুস প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল মৌলবাদকে একটি গৌণ সমস্যা হিসেবে দেখা। তারা মনে করেছে, মৌলবাদ মূলত সামাজিক বা অর্থনৈতিক বঞ্চনার ফল, এবং এটি সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই কমে যাবে। এই ধারণা শুধু ভুলই নয়, বিপজ্জনক। কারণ আধুনিক ইসলামী মৌলবাদ দারিদ্র্যের চেয়ে অনেক বেশি আদর্শিক, সংগঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত।

এই প্রশাসনের সময় ধর্মীয় দলগুলো রাজপথে ও সামাজিক পরিসরে যে মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, তা আগের অনেক সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। ওয়াজ, মাহফিল, অনলাইন প্রচার—সব জায়গায় একটি কঠোর, অসহিষ্ণু বয়ান ছড়িয়ে পড়েছে। নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু ও LGBTQ+ জনগোষ্ঠী—সবাই এই বয়ানের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র তখন কোথায় ছিল?

ইউনুস প্রশাসন প্রকাশ্যে এই বয়ানগুলোর বিরোধিতা করেনি। বরং “ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত না করা”র অজুহাতে তারা নীরব থেকেছে। রাজনীতিতে নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়—নীরবতা অনেক সময় পক্ষ নেওয়ারই আরেক রূপ। এই নীরবতাই মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে বার্তা দিয়েছে যে তারা সীমা ছাড়ালেও কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে না।

এই পরিস্থিতিতে দুর্নীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি শুধু টাকা-পয়সার লেনদেন নয়; এটি ক্ষমতার বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া। ইউনুস প্রশাসনের সময় ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রশাসনিক স্তরে একধরনের অঘোষিত সমঝোতা গড়ে উঠেছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে—ধর্মীয় দলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক বাধা ছাড়াই কার্যক্রম চালাতে পেরেছে।

এই সমঝোতার বিনিময়ে কী পাওয়া গেছে?
একটি আপাত “স্থিতিশীলতা”। কিন্তু এই স্থিতিশীলতা ছিল কৃত্রিম। কারণ মৌলবাদী শক্তিগুলো স্থিতিশীলতা চায় না—তারা চায় ধীরে ধীরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ। ইউনুস প্রশাসন এই কৌশল বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, অথবা বুঝেও উপেক্ষা করেছে।

দুর্নীতির আরেকটি রূপ ছিল নীতিগত দুর্নীতি। প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্ত মৌলবাদী চাপের কাছে নতি স্বীকার করার উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঠ্যক্রম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিল্প ও সাহিত্য—এসব ক্ষেত্রে একধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা self-censorship দেখা গেছে। রাষ্ট্র যখন নিজেই নিজেকে সেন্সর করতে শুরু করে, তখন মৌলবাদীদের আর বেশি কিছু করার দরকার পড়ে না।

এই সময়েই বাংলাদেশে LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি আরও বেড়েছে। মৌলবাদী বক্তৃতায় তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেওয়া হয়েছে, অথচ রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ইউনুস প্রশাসনের মানবাধিকার ভাষ্য এই ক্ষেত্রে ছিল সম্পূর্ণ নীরব। এই নীরবতা মৌলবাদীদের জন্য একটি স্পষ্ট সংকেত—এই জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাবে না।

ইসলামী মৌলবাদ শুধু সামাজিক নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নও। ইউনুস প্রশাসনের সময় ধর্মীয় দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়েছে। তারা গণতন্ত্রের ভাষা ব্যবহার করে গণতন্ত্রবিরোধী এজেন্ডা ছড়িয়েছে। এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে প্রশাসন কার্যকর কোনো পাল্টা ভাষ্য দাঁড় করাতে পারেনি।

দুর্নীতির প্রশ্ন আবার এখানে ফিরে আসে। কারণ একটি দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন সবসময় আপস করতে চায়। আপস মানে নীতি বিসর্জন। ইউনুস প্রশাসনের সময় এই আপসগুলো জমে জমে একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রশাসন হয়তো ভেবেছিল, মৌলবাদকে সাময়িকভাবে শান্ত রাখলে তারা বড় সংকট এড়াতে পারবে। বাস্তবে তারা সংকটকে আরও বড় করেছে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এই মৌলবাদ এখন আর প্রান্তিক নয়। এটি মূলধারার আলোচনায় ঢুকে পড়েছে। টিভি টকশো, সামাজিক মাধ্যম, জনসভা—সব জায়গায় অসহিষ্ণু বয়ান এখন স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বড় নৈরাজ্য।

ইউনুস প্রশাসনের দুর্নীতি তাই শুধু অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক নয়; এটি নৈতিক দুর্নীতি। তারা মৌলবাদকে মোকাবিলা না করে তার সঙ্গে সহাবস্থান বেছে নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করছে পুরো সমাজ।

বাংলাদেশ আজ যে ভয়াবহ অবস্থার দিকে যাচ্ছে, সেখানে ইসলামী মৌলবাদের এই বিস্তার একটি বড় চালিকাশক্তি। আর এই বিস্তারের পেছনে ইউনুস প্রশাসনের নীরবতা, দ্ব্যর্থকতা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত আপসের ভূমিকা ইতিহাসে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।

ইসলামের নামে নৈরাজ্য: ধর্মীয় রাজনীতি, মৌলবাদী শক্তি এবং ইউনুস প্রশাসনের নীরব সহাবস্থান

লিখেছেন-কমল চন্দ্র দাস

বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির ইতিহাস নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে রূপে ইসলামের নামে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছে, তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংগঠিত, বেশি দৃশ্যমান এবং বেশি বিপজ্জনক। এই নৈরাজ্য শুধু সহিংসতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক আচরণ, সাংস্কৃতিক পরিসর, শিক্ষা, আইন এবং রাজনীতির গভীরে ঢুকে পড়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ইউনুস প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—সক্রিয় সমর্থনের অভিযোগ নয়, বরং নীরব সহাবস্থান ও দ্ব্যর্থক অবস্থানের দায়

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—ইসলাম একটি ধর্ম, আর ইসলামের নামে রাজনীতি ও নৈরাজ্য এক বিষয় নয়। বাংলাদেশে যে ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়, তাদের বড় একটি অংশ ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই ব্যবহার কেবল ভোটের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের নৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করার একটি প্রচেষ্টা। নারীর অধিকার, সংখ্যালঘু সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এমনকি বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাও এই প্রচেষ্টার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

ইউনুস প্রশাসনের সময় এই প্রবণতাটি আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। প্রশাসন নিজেকে “নৈতিক ও অরাজনৈতিক” বলে দাবি করলেও বাস্তবে তারা ধর্মীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে একটি সংঘাতহীন সহাবস্থান বেছে নেয়। যুক্তি ছিল—ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত না করে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। কিন্তু ইতিহাস বলে, স্থিতিশীলতার নামে নীতিগত আপস দীর্ঘমেয়াদে নৈরাজ্যই ডেকে আনে।

ধর্মীয় দলগুলোর কৌশল ছিল ধাপে ধাপে। প্রথম ধাপ—ভাষা। ওয়াজ, মাহফিল, সামাজিক মাধ্যমের বক্তৃতায় একটি অসহিষ্ণু বয়ান ছড়ানো হয়, যেখানে “আমরা” বনাম “তারা” বিভাজন তৈরি করা হয়। এই “তারা”র তালিকায় থাকে নারী অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, সংখ্যালঘু, এবং বিশেষ করে LGBTQ+ জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্র যখন এই ভাষার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয় না, তখন সেই ভাষা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়।

দ্বিতীয় ধাপ—সামাজিক চাপ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল, বইমেলা বা নাটক নিয়ে আপত্তি, নারীর পোশাক ও চলাফেরা নিয়ে হুমকি—এসব ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই পর্যায়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিরোধমূলক নয়। প্রশাসন অনেক সময় “উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার” আহ্বান জানিয়েছে, যা কার্যত ভুক্তভোগী ও আক্রমণকারীর মধ্যে নৈতিক সমতা তৈরি করেছে।

তৃতীয় ধাপ—রাজনৈতিক বৈধতা। ধর্মীয় দলগুলো নিজেদের “জনগণের কণ্ঠ” হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে। গণতন্ত্রের ভাষা ব্যবহার করে তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। ইউনুস প্রশাসন এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো পাল্টা ভাষ্য দাঁড় করাতে পারেনি। বরং প্রশাসনের কিছু বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত এই দলগুলোর দাবিকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিয়েছে—এমন অভিযোগ সমালোচকদের।

এখানে দুর্নীতির প্রশ্ন আবার সামনে আসে। দুর্নীতি মানে শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন নয়; এটি ক্ষমতার বিনিময়ে নীতি বিসর্জন। ইউনুস প্রশাসনের সময় ধর্মীয় সংগঠনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক ছাড় পেয়েছে—অনুমতি, নজরদারির শিথিলতা, কিংবা আইনি কঠোরতার অভাব। এই সুবিধাগুলো সরাসরি দুর্নীতির প্রমাণ না হলেও, এটি নীতিগত দুর্নীতির একটি রূপ—যেখানে রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে সরে আসে।

এই নৈরাজ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে নারীদের ও LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর ওপর। ধর্মীয় দলগুলোর বক্তৃতায় তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেওয়া হয়েছে, অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সুরক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্ব পায়নি। ইউনুস প্রশাসনের মানবাধিকার-ভাষ্য এই ক্ষেত্রে প্রায় অদৃশ্য। এই নীরবতা মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারহীনতা। ধর্মীয় সহিংসতা বা হুমকির ঘটনায় বিচার না হলে একটি বার্তা যায়—এই কাজগুলোর শাস্তি নেই। বিচারবিভাগের অকার্যকারিতা এখানে নৈরাজ্যকে আরও উৎসাহিত করেছে। রাষ্ট্র যখন আইনের শাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন ধর্মীয় দলগুলো নিজেদের নৈতিক পুলিশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় ইউনুস প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে কাউকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া নয়। বরং এটি একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ—কীভাবে নীরবতা, আপস ও দ্ব্যর্থকতা মৌলবাদী নৈরাজ্যের পথ প্রশস্ত করে। প্রশাসন হয়তো ভেবেছিল, ধর্মীয় শক্তিগুলোকে ক্ষেপালে বড় সংকট তৈরি হবে। বাস্তবে তারা সংকটকে জমিয়ে রেখেছে, যা এখন বিস্ফোরণের মুখে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে—ধর্মীয় রাজনীতিকে যদি স্পষ্টভাবে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে না আনা যায়, তাহলে ইসলামের নামে নৈরাজ্য সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়বে। ইউনুস প্রশাসনের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দেয়: নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করে নীরব থাকা কখনোই নিরপেক্ষতা নয়।

এই নৈরাজ্যের দায় কেবল ধর্মীয় দলগুলোর নয়; দায় রাষ্ট্রেরও, যে রাষ্ট্র সময়মতো সীমারেখা টানতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ যদি এই পথ থেকে ফিরতে চায়, তবে প্রথম কাজ হবে—ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে সম্মান করা, আর ধর্মীয় রাজনীতিকে আইনের কঠোর আওতায় আনা।

ইউনুস প্রশাসনের দুর্নীতি: এনজিও–নেটওয়ার্ক, নীতিগত আপস ও ইসলামী মৌলবাদের সঙ্গে বিপজ্জনক সহাবস্থান

লিখেছেন-সমীর হালদার

দুর্নীতি সাধারণত আমরা কল্পনা করি ঘুষ, কমিশন বা নগদ লেনদেনের মাধ্যমে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। এটি ঘটে নীতিগত স্তরে—যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জনস্বার্থের বদলে সুবিধাজনক আপসের ভিত্তিতে। ইউনুস প্রশাসনের সময় বাংলাদেশে যে ধরনের দুর্নীতি বিস্তার লাভ করেছে, তা এই নীতিগত দুর্নীতির একটি পাঠ্যবই-সম উদাহরণ।

এই প্রশাসন নিজেকে শুরু থেকেই “নৈতিক বিকল্প” হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতির বিপরীতে তারা দেখাতে চেয়েছিল একটি টেকনোক্র্যাটিক, এনজিও-ঘেঁষা এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা। কিন্তু সমস্যা হলো—নৈতিকতার দাবি যত বড়, জবাবদিহির প্রয়োজন তত বেশি। ইউনুস প্রশাসনের ক্ষেত্রে এই জবাবদিহিই ছিল সবচেয়ে দুর্বল।

প্রথমেই আসা যাক এনজিও–নেটওয়ার্কের প্রশ্নে। ইউনুস প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল একটি শক্তিশালী এনজিও ও বুদ্ধিজীবী নেটওয়ার্ক, যারা দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এই নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রকে দেখে প্রকল্পের সমষ্টি হিসেবে—যেখানে সমস্যা মানেই নতুন একটি ফান্ডিং সুযোগ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা সামাজিক দ্বন্দ্বগুলো প্রায়ই “ম্যানেজেবল রিস্ক” হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই এনজিও-ঘেঁষা শাসনব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো—এটি সংঘাত এড়াতে চায়। সংঘাত মানে অস্থিরতা, আর অস্থিরতা মানে আন্তর্জাতিক দাতাদের অস্বস্তি। এই মানসিকতার ফলেই ইসলামী মৌলবাদের মতো একটি গভীর রাজনৈতিক সমস্যাকে প্রশাসন প্রায়শই “সামাজিক ইস্যু” বা “উগ্র প্রান্তিকতা” হিসেবে ছোট করে দেখাতে চেয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু ভুল নয়; এটি বিপজ্জনক।

ইসলামী মৌলবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ব্যাধি নয়। এটি একটি সংগঠিত আদর্শিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য রাষ্ট্র ও সমাজকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যার অধীনে আনা। ইউনুস প্রশাসনের সময় এই মৌলবাদী শক্তিগুলো যে মাত্রায় সাংগঠনিক ও সামাজিক পরিসর বিস্তার করতে পেরেছে, তা কাকতালীয় নয়। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধের অভাবের সরাসরি ফল।

এখানেই দুর্নীতির প্রশ্নটি নতুন মাত্রা পায়। কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া নয়; এটি নীতি বিসর্জনের বিনিময়ে শান্তি কেনা। ইউনুস প্রশাসনের সময় ধর্মীয় সংগঠন ও দলের সঙ্গে যে অঘোষিত সহাবস্থান গড়ে উঠেছিল, তা অনেক বিশ্লেষকের চোখে একটি নীতিগত দুর্নীতির উদাহরণ। প্রশাসন হয়তো ভেবেছিল—এই শক্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জ না করলে তারা রাজপথে নৈরাজ্য করবে না। কিন্তু ইতিহাস বলে, মৌলবাদ কখনো তুষ্ট হয় না; সে সুযোগ পেলেই আরও এগোয়।

এই সহাবস্থানের একটি বড় লক্ষণ ছিল প্রশাসনিক শিথিলতা। ধর্মীয় উগ্র বক্তব্য, ঘৃণামূলক ভাষণ, সংখ্যালঘু ও LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হুমকি—এসব ঘটনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল ও বিলম্বিত। অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনের বক্তব্য ছিল অস্পষ্ট—“উভয় পক্ষকে সংযম দেখাতে হবে।” এই ধরনের বক্তব্য কার্যত আক্রমণকারী ও আক্রান্তকে একই কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়।

এই নীরবতা ও দ্ব্যর্থকতা মৌলবাদীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—তারা সীমা ছাড়ালেও রাষ্ট্র কঠোর হবে না। এটি দুর্নীতিরই একটি রূপ, কারণ রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন না করে সুবিধাজনক অবস্থান নেয়। এই সুবিধাজনক অবস্থানের মূল্য দিতে হয় সমাজকে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইউনুস প্রশাসনের সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে কথাবার্তা বলা হয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ ছিল। কিছু রাজনৈতিক শক্তি ও ব্যক্তি সমালোচনার মুখে পড়লেও, ধর্মীয় নেটওয়ার্ক বা প্রভাবশালী সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে ছিল এক ধরনের অঘোষিত ছাড়। এই নির্বাচনী নৈতিকতা দুর্নীতিরই একটি চিহ্ন।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু, LGBTQ+ জনগোষ্ঠী এবং মুক্তচিন্তার মানুষ। মৌলবাদী চাপের মুখে রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে, তখন এই জনগোষ্ঠীগুলো বুঝে নেয়—তারা একা। এই একাকীত্বই মৌলবাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

ইউনুস প্রশাসনের দুর্নীতি তাই কোনো একক কেলেঙ্কারি নয়; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। এটি সেই শাসনব্যবস্থার ফল, যেখানে নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলাকে বুদ্ধিমত্তা মনে করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্র চালানো মানে শুধু সংঘাত এড়ানো নয়; রাষ্ট্র চালানো মানে সঠিক জায়গায় স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য একটি ভুল শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। যদি মানুষ দেখে যে “ভালো কথা বলা” প্রশাসনও মৌলবাদকে ঠেকাতে ব্যর্থ, তাহলে তারা হয়তো গণতন্ত্রেই আস্থা হারাবে। এই আস্থাহীনতা থেকেই জন্ম নেয় চরমপন্থা।

বাংলাদেশ আজ যে সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ইউনুস প্রশাসনের সময়ের এই নীতিগত দুর্নীতির হিসাব একদিন না একদিন দিতেই হবে। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন তোলে—কে কী করেছিল তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কে কী করা থেকে বিরত ছিল

হাসিনার আমলেই ভালো ছিলাম”: নস্টালজিয়া, তুলনামূলক রাজনীতি ও বাংলাদেশের কঠিন বাস্তবতা

লিখেছেন- রাজীব সাহা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কথোপকথনে একটি বাক্য ক্রমেই ফিরে ফিরে আসছে—“হাসিনার আমলেই ভালো ছিলাম।” এই বাক্যটি শুধু একটি ব্যক্তিগত মতামত নয়; এটি একটি সামাজিক মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন। যেসব মানুষ একসময় শেখ হাসিনার শাসনের কঠোর সমালোচক ছিলেন, তারাও আজ অনেক ক্ষেত্রে এই বাক্য উচ্চারণ করছেন। প্রশ্ন হলো—এটি কি রাজনৈতিক অজ্ঞতা, নাকি বর্তমান বাস্তবতার একটি নির্মম মূল্যায়ন?

প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার, “ভালো ছিলাম” কথাটি আপেক্ষিক। শেখ হাসিনার শাসনামল নিঃসন্দেহে বিতর্কহীন ছিল না। গণতন্ত্রের সংকোচন, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন—এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। কিন্তু রাজনীতি কেবল আদর্শের জায়গা নয়; এটি বাস্তবতারও জায়গা। মানুষ শেষ পর্যন্ত তুলনা করে—কে কতটা নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা দিতে পেরেছে।

এই তুলনার জায়গাতেই বর্তমান সময় পিছিয়ে পড়ছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে রাষ্ট্র ছিল শক্তিশালী—কখনো কখনো অতিরিক্ত শক্তিশালী। কিন্তু সেই শক্তির একটি ফল ছিল নিয়ন্ত্রণ। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে যতটা সাহস দেখাচ্ছে এখন, সেই সাহস তারা তখন দেখাতে পারেনি। রাষ্ট্রের বার্তা ছিল স্পষ্ট—সহিংসতা ও নৈরাজ্যের একটি সীমা আছে। এই সীমারেখা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, সীমার অস্তিত্ব ছিল।

বর্তমান বাস্তবতায় সেই সীমারেখা অস্পষ্ট। ইউনুস প্রশাসনের সময় “নৈতিকতা” ও “সংলাপ”-এর ভাষা ব্যবহার করে সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এর ফল হয়েছে উল্টো। মৌলবাদী শক্তিগুলো এই ভাষাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেছে। তারা বুঝেছে—রাষ্ট্র এখন কঠোর নয়, দ্ব্যর্থক। এই উপলব্ধিই তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

এখানেই মানুষের মনে তুলনা আসে। মানুষ ভাবে—আগে হয়তো কথা বলা কঠিন ছিল, কিন্তু রাস্তায় চলতে ভয় পেতাম না। এখন হয়তো কথা বলার ভাষা নরম, কিন্তু চারপাশে এক ধরনের অনিরাপত্তা। এই অনিরাপত্তা শুধু শারীরিক নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও মানসিক। বইমেলা, নাটক, গান, পোশাক—সবকিছুই এখন বিতর্কের বিষয়।

আরেকটি বড় তুলনার জায়গা হলো বিচার ও শাসনের কার্যকারিতা। হাসিনার আমলে বিচারবিভাগ পুরোপুরি স্বাধীন ছিল—এ কথা কেউই জোর দিয়ে বলবেন না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কার্যকর হতো। আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ছিল। এখন সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়েছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনেক সময় দেরিতে আসে, বা আসে দ্ব্যর্থক ভাষায়। এই অনিশ্চয়তাই মানুষের আস্থাকে দুর্বল করেছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও নস্টালজিয়া তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক সংকট থাকা সত্ত্বেও মানুষ মনে করে—আগে জীবনযাত্রা তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য ছিল। এখন মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র। এই উদ্বেগ রাজনীতিকে ছাড়িয়ে দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তুলনার জায়গা হলো রাষ্ট্র বনাম মৌলবাদ। শেখ হাসিনার আমলে রাষ্ট্র ও মৌলবাদী শক্তির সম্পর্ক ছিল সংঘাতপূর্ণ। এই সংঘাত গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, এটি একটি বার্তা দিত—রাষ্ট্র তার কর্তৃত্ব ছাড়বে না। ইউনুস প্রশাসনের সময় সেই বার্তাটি আর স্পষ্ট নয়। “ধর্মীয় অনুভূতি”র কথা বলে মৌলবাদী বক্তব্য ও চাপকে সহনীয় করে তোলার প্রবণতা দেখা গেছে। এই পরিবর্তন মানুষ গভীরভাবে অনুভব করছে।

এই প্রেক্ষাপটে “হাসিনার আমলেই ভালো ছিলাম” বলা মানে হাসিনার সব নীতি সমর্থন করা নয়। এটি আসলে একটি নস্টালজিক প্রতিক্রিয়া—যেখানে মানুষ একটি পরিচিত কঠোরতার সঙ্গে বর্তমানের অনিশ্চয়তাকে তুলনা করছে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। যখন বর্তমান সময় ভয়ংকর মনে হয়, মানুষ অতীতের দোষগুলো ছোট করে দেখে।

তবে এই নস্টালজিয়াও বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এটি ভবিষ্যতের রাজনীতিকে ভুল পথে নিতে পারে। যদি মানুষ কেবল শক্ত হাতের শাসনকেই নিরাপত্তার একমাত্র উৎস মনে করে, তাহলে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। এই দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু।

এখানে ইউনুস প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো—তারা একটি বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় পথ তৈরি করতে পারেনি। একদিকে হাসিনার কঠোর রাষ্ট্র, অন্যদিকে মৌলবাদী নৈরাজ্য—এই দুইয়ের মাঝখানে একটি কার্যকর, নীতিগতভাবে দৃঢ়, কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। সেই সুযোগ হারানো হয়েছে।

মানুষ তাই তুলনা করছে, বিকল্প খুঁজছে। আর সেই তুলনায় অতীত অনেক সময় কম ভয়ংকর মনে হয়—যদিও তা নিখুঁত ছিল না।

“হাসিনার আমলেই ভালো ছিলাম” আসলে একটি সতর্ক সংকেত। এটি বলছে—বর্তমান শাসনব্যবস্থা মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এই বার্তাকে উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও কঠিন হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই নির্ধারিত হবে—আমরা কি অতীতের কঠোরতায় ফিরে যাব, নাকি বর্তমানের দুর্বলতা কাটিয়ে একটি নতুন, দৃঢ় কিন্তু গণতান্ত্রিক পথ তৈরি করতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো খোলা। কিন্তু একটাই বিষয় নিশ্চিত—মানুষ আর অস্পষ্টতা চায় না।

বিচারবিভাগের অকার্যকারিতা: যখন ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের বদলে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে

লিখেছেন- মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন

কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সামরিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় একটি প্রশ্নে—সাধারণ মানুষ কি ন্যায়বিচার পেতে পারে? বাংলাদেশে এই প্রশ্নের উত্তর ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। আদালত আছে, বিচারক আছেন, আইন আছে—তবুও ন্যায়বিচার যেন নাগালের বাইরে। বিচারবিভাগ আজ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, আর এই অকার্যকারিতা সমাজের প্রতিটি স্তরে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের বিচারবিভাগের সংকট নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরও গভীর হয়েছে। মামলার জট, দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা—সব মিলিয়ে বিচার এখন আর একটি অধিকার নয়, বরং একটি দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যাত্রা। সাধারণ মানুষের কাছে আদালত মানেই বছর বছর ঘোরানো, খরচ, মানসিক চাপ, এবং শেষ পর্যন্ত হতাশা।

এই সংকটের প্রথম স্তর হলো মামলার পাহাড়। লাখ লাখ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। একটি দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে দশ বছর লেগে যাওয়া এখন অস্বাভাবিক নয়। এই দীর্ঘসূত্রতা শুধু বিচারপ্রার্থীর ক্ষতি করে না; এটি ন্যায়বিচারের ধারণাকেই দুর্বল করে। দেরিতে পাওয়া বিচার কার্যত বিচার না পাওয়ারই আরেক নাম।

দ্বিতীয় স্তর হলো ক্ষমতা ও প্রভাবের অসমতা। বাংলাদেশে আইন কাগজে-কলমে সবার জন্য সমান, কিন্তু বাস্তবে নয়। ক্ষমতাবানদের জন্য আইন নমনীয়, দুর্বলদের জন্য কঠোর—এই ধারণা সমাজে গভীরভাবে গেঁথে গেছে। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থান বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে—এমন বিশ্বাস যদি জনগণের মধ্যে জন্ম নেয়, তাহলে বিচারবিভাগের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক।

ইউনুস প্রশাসনের সময় বিচার সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবে খুব কম অগ্রগতি হয়েছে। প্রশাসন নৈতিকতার ভাষায় কথা বলেছে, কিন্তু বিচারবিভাগের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়নি। কারণ বিচারবিভাগ কার্যকর হলে সবচেয়ে আগে প্রশ্নের মুখে পড়ে ক্ষমতাকেন্দ্র। এই বাস্তবতা প্রায় সব শাসনামলেই সত্য, কিন্তু নৈতিকতার দাবি করা প্রশাসনের ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিচারবিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ক। সাংবিধানিকভাবে বিচারবিভাগ স্বাধীন হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক নির্ভরতা রয়ে গেছে। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি—এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব বিচারকদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশকে দুর্বল করে। একজন বিচারক যদি মনে করেন, একটি রায় তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে ন্যায়বিচার ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এই অকার্যকারিতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে সংবেদনশীল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। নারী, সংখ্যালঘু, LGBTQ+ জনগোষ্ঠী, দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ—এরা আদালতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হয়। মামলা করতে ভয় পায়, কারণ তারা জানে—প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং ফল অনিশ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ ও হুমকির কারণে তারা মামলা করতেই পারে না।

ধর্মীয় সহিংসতা ও মৌলবাদী হুমকির ক্ষেত্রেও বিচারবিভাগের দুর্বলতা স্পষ্ট। ঘৃণামূলক বক্তব্য, হুমকি বা সহিংসতার ঘটনায় বিচার না হলে একটি বার্তা যায়—এই অপরাধগুলোর শাস্তি নেই। ইউনুস প্রশাসনের সময় এই ধরনের ঘটনায় বিচারিক অগ্রগতি ছিল সীমিত। প্রশাসন অনেক সময় “পরিস্থিতি শান্ত রাখা”র দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দিকে নয়।

এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি মৌলবাদী ও চরমপন্থী শক্তিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় পুঁজি। তারা জানে—আইন প্রয়োগ দুর্বল, বিচার দীর্ঘসূত্রতা ভরা। ফলে তারা আরও সাহসী হয়। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

বিচারবিভাগের অকার্যকারিতা দুর্নীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনে বিচার দুর্বল হয়, আর দুর্বল বিচার দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে। এই দুষ্টচক্র ভাঙা না গেলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আইনের শাসন হারায়। ইউনুস প্রশাসনের সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে বক্তব্য ছিল, তা বিচারবিভাগকে শক্তিশালী করার বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়নি।

আরেকটি দিক হলো জনগণের মানসিক পরিবর্তন। মানুষ যখন দেখে আদালত কাজ করছে না, তখন তারা বিকল্প পথ খোঁজে। কেউ প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারীর শরণাপন্ন হয়, কেউ সামাজিক চাপ বা সালিশে যায়, কেউ আবার সহিংসতার পথ বেছে নেয়। এই প্রবণতা সমাজকে আরও অনিরাপদ করে তোলে।

বিচারবিভাগের ব্যর্থতা গণতন্ত্রকেও দুর্বল করে। নির্বাচন, মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক অধিকার—সবকিছু শেষ পর্যন্ত বিচারিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। যখন এই সুরক্ষা দুর্বল হয়, তখন গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—বিচারবিভাগ কি সত্যিই সংস্কারযোগ্য, নাকি এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে আটকে আছে? ইতিহাস বলছে, বিচার সংস্কার সম্ভব, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ইউনুস প্রশাসনের সময় সেই অঙ্গীকার দৃশ্যমান ছিল না। নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করে বিচারিক সংকট এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ যদি এই পথেই এগোয়, তাহলে বিচারবিভাগ আরও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। আর একটি রাষ্ট্র যেখানে আদালত মানুষের শেষ আশ্রয় নয়, সেখানে আইন নয়—শক্তিই শেষ কথা হয়ে ওঠে।

বিচারবিভাগের অকার্যকারিতা তাই শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি সামাজিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। এই সংকট মোকাবিলা না করলে বাংলাদেশ যে ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, তা আর কল্পনা নয়—বাস্তবতা।

বাংলাদেশে LGBTQ+ জনগোষ্ঠী: মৌলবাদ, রাষ্ট্রীয় নীরবতা ও অস্তিত্বের লড়াই

লিখেছেন-এম ডি সামিউল আলম

বাংলাদেশে LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর জীবনকে যদি এক বাক্যে বর্ণনা করতে হয়, তবে সেটি হবে—নীরব লড়াই। এই লড়াই রাজপথে নয়, সংবাদ সম্মেলনে নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের ভেতরে। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, এমনকি নিজের শরীর ও পরিচয়ের ভেতরেও এই লড়াই চলতে থাকে। রাষ্ট্রীয় নীতিতে তারা অদৃশ্য, সামাজিক কল্পনায় তারা অস্বীকৃত, আর মৌলবাদী বয়ানে তারা শত্রু।

এই বাস্তবতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউনুস প্রশাসনের সময় মৌলবাদী শক্তিগুলোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিও বেড়েছে। এই ঝুঁকি শুধু সহিংসতার নয়; এটি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাবের সমষ্টি।

বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতেই LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রয়ে গেছে। সমকামিতা এখনো অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও এই আইন সবসময় প্রয়োগ করা হয় না, তবু এর অস্তিত্বই একটি ভয়াবহ অস্ত্র। কারণ এটি মৌলবাদী গোষ্ঠী ও সামাজিক নিপীড়কদের জন্য একটি বৈধতা তৈরি করে—ঘৃণা, হুমকি ও সহিংসতাকে “আইনসম্মত নৈতিকতা”র মোড়কে উপস্থাপন করার সুযোগ দেয়।

ইউনুস প্রশাসনের সময় মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তি ও নৈতিকতার ভাষা বারবার উচ্চারিত হলেও LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর বিষয়ে ছিল এক ধরনের নীরবতা। এই নীরবতা কাকতালীয় নয়। কারণ মৌলবাদী শক্তিগুলো এই জনগোষ্ঠীকে তাদের আদর্শিক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং প্রশাসন সেই শক্তিগুলোর সঙ্গে সংঘাতে যেতে অনিচ্ছুক ছিল। ফলাফল—রাষ্ট্রীয় নীতিতে LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা কোনো অগ্রাধিকার পায়নি।

এই নীরবতার মূল্য চুকাতে হয়েছে বাস্তব জীবনে। LGBTQ+ ব্যক্তিরা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন, অনেক ক্ষেত্রে চাকরি হারান বা নিয়োগই পান না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তারা বুলিং, হুমকি ও সামাজিক একঘরে হওয়ার মুখোমুখি হন। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে—অনেক চিকিৎসকই তাদের পরিচয় জানার পর সেবা দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এই সবকিছু মিলিয়ে তাদের জীবন হয়ে ওঠে এক ধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তা।

মৌলবাদী বয়ান এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ওয়াজ-মাহফিল, সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন ভিডিওতে LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে। তাদের “নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক” হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র যখন এই বয়ানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয় না, তখন সেই বয়ান সমাজে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক—কারণ তখন সহিংসতা আর ব্যতিক্রম থাকে না।

এই পরিস্থিতিতে বিচারবিভাগের অকার্যকারিতা আরও একটি বড় সমস্যা। LGBTQ+ ব্যক্তিরা হুমকি বা সহিংসতার শিকার হলেও মামলা করতে ভয় পান। তারা জানেন—বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ, সামাজিক চাপ প্রবল, আর ফল অনিশ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশও অভিযোগ নিতে অনিচ্ছুক হয়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি মৌলবাদী ও নিপীড়কদের সাহস বাড়িয়ে দেয়।

ইউনুস প্রশাসনের সময় এই সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেখা যায়নি। প্রশাসন হয়তো ভেবেছিল, এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বললে ধর্মীয় গোষ্ঠীর ক্ষোভ বাড়বে। কিন্তু এই হিসাবনিকাশে একটি মৌলিক বিষয় উপেক্ষিত হয়েছে—রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার সব নাগরিককে সমানভাবে রক্ষা করা। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়াই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সবচেয়ে স্পষ্ট চিহ্ন।

এই ব্যর্থতার আরেকটি দিক হলো প্রতীকী অন্তর্ভুক্তির অভাব। কোনো রাষ্ট্র যখন কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই স্বীকার করে না, তখন নীতিগত পরিবর্তনের আশা করা কঠিন। ইউনুস প্রশাসনের সময় LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব, আলোচনা বা পরামর্শ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তির উদাহরণ খুবই সীমিত। ফলে নীতিনির্ধারণে তাদের কণ্ঠ অনুপস্থিত থেকেছে।

এই অবস্থার প্রভাব শুধু LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। কারণ যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত অন্য নাগরিকদেরও রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। আজ যারা নিঃশব্দে নিপীড়িত, কাল সেই তালিকায় অন্যরাও যুক্ত হতে পারে।

এই বাস্তবতায় অনেক LGBTQ+ ব্যক্তি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। যারা পারেন না, তারা দুই জীবন বাঁচেন—একটি সমাজের সামনে, আরেকটি গোপনে। এই দ্বৈত জীবন মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মসম্মান ও সামাজিক বন্ধনকে ভেঙে দেয়। রাষ্ট্রের নীরবতা এই ভাঙনকে আরও গভীর করে।

মৌলবাদ ও রাষ্ট্রীয় নীরবতার এই যুগলবন্দি বাংলাদেশকে একটি ভয়াবহ পথে ঠেলে দিচ্ছে—যেখানে বৈচিত্র্যকে হুমকি হিসেবে দেখা হয়, আর মানবাধিকারকে আপসের বিষয় বানানো হয়। ইউনুস প্রশাসনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করলেই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র তৈরি হয় না। তার জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট নীতি, আইনি সংস্কার এবং সাহসী রাজনৈতিক অবস্থান।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি আধুনিক, মানবিক রাষ্ট্র হতে চায়, তাহলে LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করার পথ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। এই জনগোষ্ঠী কোনো বিদেশি ধারণা নয়; তারা এই সমাজেরই অংশ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা নয়—এটি রাষ্ট্রের নৈতিক মেরুদণ্ডকে শক্ত করা।

এই ব্লগ কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি প্রশ্ন। বাংলাদেশ কি তার নাগরিকদের মানুষ হিসেবে দেখবে, নাকি পরিচয়ের ভিত্তিতে বাছাই করবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—আমরা কোন পথে যাচ্ছি।

তরুণ সমাজ, হতাশা ও চরমপন্থার ফাঁদ: একটি হারানো প্রজন্মের নীরব বিপর্যয়

লিখেছেন-ওমর ফারুক

বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণ সমাজ সবসময় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি বড় রাজনৈতিক মোড়ে তরুণরাই ছিল সবচেয়ে সামনে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই তরুণ সমাজকে আর রাজপথে, সংস্কৃতিতে বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আগের মতো দেখা যায় না। এর মানে এই নয় যে তারা উদাসীন হয়ে গেছে; বরং তারা হতাশ, বিভ্রান্ত এবং গভীরভাবে অনিশ্চিত

এই হতাশা হঠাৎ জন্ম নেয়নি। এটি তৈরি হয়েছে ধারাবাহিক ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে—জুলাই আন্দোলনের পতন, বিচারবিভাগের অকার্যকারিতা, ইউনুস প্রশাসনের নীতিগত দুর্বলতা এবং ক্রমবর্ধমান মৌলবাদী চাপের মধ্য দিয়ে। তরুণরা দেখেছে, রাজনীতিতে অংশ নিয়ে ফল পাওয়া যায় না; আবার রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয় না। এই দ্বিমুখী সংকট তাদের সামনে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে।

প্রথমেই আসা যাক কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রশ্নে। শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ আজ বেকার বা অস্থায়ী কাজের সঙ্গে যুক্ত। পড়াশোনা শেষ করেও তারা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। ইউনুস প্রশাসনের সময় অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তরুণদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। এই ব্যর্থতা তরুণদের মনে রাষ্ট্রের প্রতি গভীর অনাস্থা জন্ম দিয়েছে।

এই অনাস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব। তরুণরা দেখে—নীতিনির্ধারণে তাদের কণ্ঠ নেই। রাজনীতি যেন একটি বন্ধ ক্লাব, যেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত। ইউনুস প্রশাসনের “টেকনোক্র্যাটিক” শাসন এই দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে। নীতিগত আলোচনা হয়েছে, কিন্তু অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি হয়নি। তরুণদের জন্য রাজনীতি হয়ে উঠেছে দূরের ও অর্থহীন।

এই শূন্যতার মধ্যেই চরমপন্থী ও মৌলবাদী শক্তিগুলো সুযোগ খুঁজে নেয়। তারা তরুণদের সামনে একটি সহজ ব্যাখ্যা হাজির করে—তোমার কষ্টের কারণ একটি নির্দিষ্ট শত্রু; সমাধান একটি নির্দিষ্ট আদর্শ। এই সরলীকরণ তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, কারণ বাস্তব রাজনীতি তাদের কাছে জটিল, দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিষ্ফল মনে হয়।

ইউনুস প্রশাসনের সময় এই চরমপন্থী বয়ানগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পাল্টা ভাষ্য ছিল দুর্বল। তরুণদের জন্য কোনো শক্তিশালী, প্রগতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ন্যারেটিভ গড়ে তোলা হয়নি। বরং “সংলাপ”, “সহনশীলতা” এবং “স্থিতিশীলতা”-র ভাষা ব্যবহার করে সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ভাষা তরুণদের কাছে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিজিটাল পরিসর। সামাজিক মাধ্যম আজ তরুণদের প্রধান তথ্যসূত্র। এখানেই মৌলবাদী ও চরমপন্থী কনটেন্ট সবচেয়ে সক্রিয়। সহজ ভিডিও, আবেগী ভাষা, নৈতিক উচ্চাসন—এই উপাদানগুলো তরুণদের দ্রুত প্রভাবিত করে। রাষ্ট্র এই পরিসরে কার্যকর উপস্থিতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউনুস প্রশাসনের সময় ডিজিটাল ন্যারেটিভ যুদ্ধ কার্যত একপাক্ষিক ছিল।

এই পরিস্থিতিতে তরুণদের একটি অংশ সম্পূর্ণ রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়েছে। তারা ভাবছে—কিছুই বদলানো সম্ভব নয়। এই উদাসীনতা নিজেই একটি বিপদ, কারণ এটি গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে। আরেকটি অংশ বিপরীত দিকে যাচ্ছে—চরম আদর্শের দিকে। এই দুই প্রবণতাই রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।

দুর্নীতির প্রশ্ন এখানেও ফিরে আসে। তরুণরা দেখে—যোগ্যতা নয়, সংযোগই সাফল্যের চাবিকাঠি। এই অভিজ্ঞতা তাদের নৈতিক বোধকে আঘাত করে। যখন রাষ্ট্র নিজেই ন্যায়সংগত সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তরুণরা বিকল্প নৈতিক কাঠামো খোঁজে। মৌলবাদ এই শূন্যতা পূরণ করে একটি কঠোর, কিন্তু স্পষ্ট নৈতিক কোড দিয়ে।

এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে তরুণ নারীরা ও LGBTQ+ তরুণরা। তারা দ্বিগুণ চাপে থাকে—একদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে সামাজিক ও মৌলবাদী নিপীড়ন। রাষ্ট্রীয় নীরবতা তাদের আরও একা করে তোলে। ইউনুস প্রশাসনের সময় এই তরুণদের জন্য কোনো বিশেষ সুরক্ষা বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি দৃশ্যমান হয়নি।

তরুণ সমাজের এই হতাশা কেবল একটি প্রজন্মের সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যতের রাষ্ট্রের রূপরেখা নির্ধারণ করে। যে তরুণ আজ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আগামীকাল হয়তো চরমপন্থার সহজ শিকার হবে—অথবা সম্পূর্ণভাবে দেশ ছাড়বে। এই “ব্রেইন ড্রেইন” ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এই প্রেক্ষাপটে ইউনুস প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল আশার রাজনীতি তৈরি করতে না পারা। নৈতিকতার ভাষা তরুণদের অনুপ্রাণিত করেনি, কারণ তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিল। মৌলবাদ এই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়েছে। এটি তরুণদের বলেছে—তোমার কষ্টের মানে আছে, তোমার লড়াই পবিত্র। এই ভাষা বিপজ্জনক, কিন্তু কার্যকর।

বাংলাদেশ যদি এই পথ থেকে ফিরতে চায়, তাহলে তরুণ সমাজকে আবার কেন্দ্রে আনতে হবে। কর্মসংস্থান, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, বিচারিক ন্যায্যতা এবং স্পষ্টভাবে মৌলবাদবিরোধী রাষ্ট্রীয় অবস্থান—এই চারটি ছাড়া কোনো সমাধান নেই। তরুণদের শুধু উপদেশ দিলে হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ দেখাতে হবে।

এই ব্লগ কোনো অভিযোগপত্র নয়; এটি একটি সতর্ক সংকেত। একটি প্রজন্ম হারিয়ে গেলে রাষ্ট্রের পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তরুণদের হতাশা চরমপন্থার জ্বালানিতে পরিণত হতে পারে—অথবা সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে নতুন আশার জন্ম দিতে পারে।

পছন্দটা রাষ্ট্রের।

ইউনুস প্রশাসনের সময় দুর্নীতির নতুন ভাষা: নৈতিকতার আড়ালে ক্ষমতা, নীরবতা ও মৌলবাদী আপস

লিখেছেন-রাজন কুমার সাহা

বাংলাদেশে দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির রূপ বদলেছে, ভাষা বদলেছে, এমনকি তা নিজেকে নৈতিকতার মোড়কেও উপস্থাপন করতে শিখেছে। ইউনুস প্রশাসনের সময় এই পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এখানে দুর্নীতি আর কেবল ঘুষ, কমিশন বা টাকার লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি রূপ নিয়েছে নীতিগত আপস, নির্বাচনী নীরবতা এবং সুবিধাজনক সহাবস্থানে

এই প্রশাসন নিজেকে শুরু থেকেই “নৈতিক বিকল্প” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির বিপরীতে তারা দেখাতে চেয়েছিল—এখানে স্বচ্ছতা আছে, দলীয় স্বার্থ নেই, আছে কেবল ভালো শাসন। এই ভাষ্য বহু মানুষের কাছে আকর্ষণীয় ছিল, কারণ মানুষ ক্লান্ত ছিল পুরোনো রাজনীতির কদর্যতায়। কিন্তু সমস্যা হলো—নৈতিকতার দাবি যত বড়, তার ব্যর্থতাও তত গভীর হয়।

ইউনুস প্রশাসনের সময় দুর্নীতির প্রথম নতুন রূপ ছিল নীতিগত দুর্নীতি। অর্থাৎ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, যা সরাসরি আইন ভাঙে না, কিন্তু রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বকে দুর্বল করে। মৌলবাদী শক্তির ক্ষেত্রে এই নীতিগত দুর্নীতি সবচেয়ে স্পষ্ট। প্রশাসন সরাসরি এই শক্তিগুলোকে সমর্থন করেছে—এমন অভিযোগ করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি সময়মতো স্পষ্টভাবে বিরোধিতা করেছে? বাস্তবতা বলছে—না।

এই নীরবতা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি হিসাবি সিদ্ধান্ত। প্রশাসনের ভেতরে একটি ধারণা কাজ করছিল—ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘাতে গেলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে, আন্তর্জাতিক ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, উন্নয়ন প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়বে। এই হিসাবের ফলেই মৌলবাদকে প্রায়শই “ম্যানেজ” করার চেষ্টা করা হয়েছে, মোকাবিলা করা হয়নি। এই ম্যানেজমেন্টই দুর্নীতির একটি রূপ।

দ্বিতীয় রূপটি হলো এনজিও–রাষ্ট্রের অস্পষ্ট সীমারেখা। ইউনুস প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এনজিও ও বুদ্ধিজীবী নেটওয়ার্ক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এনজিওগুলো সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যা হয় যখন রাষ্ট্র নিজেই এনজিওর ভাষা, অগ্রাধিকার ও কৌশলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন গণতান্ত্রিক জবাবদিহির জায়গা সংকুচিত হয়।

এই এনজিও-ঘেঁষা শাসনব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য হলো সংঘাত এড়ানোর প্রবণতা। মৌলবাদ, ধর্মীয় উগ্রতা বা সামাজিক নৈরাজ্য—এসবকে তারা প্রায়শই “সেনসিটিভ ইস্যু” হিসেবে চিহ্নিত করে। সেনসিটিভ মানে, এখানে শক্ত অবস্থান নেওয়া যাবে না। এই মানসিকতা মৌলবাদী শক্তির জন্য এক ধরনের অঘোষিত ছাড় তৈরি করে।

এই ছাড়ের ফল দেখা গেছে মাঠে-ময়দানে। ধর্মীয় দলগুলো ওয়াজ-মাহফিল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক প্রচারে আরও আক্রমণাত্মক বয়ান ছড়াতে পেরেছে। নারীর অধিকার, সংখ্যালঘু, LGBTQ+ জনগোষ্ঠী—এরা হয়ে উঠেছে প্রধান লক্ষ্যবস্তু। রাষ্ট্র যখন এই বয়ানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও ধারাবাহিক আইনি ব্যবস্থা নেয় না, তখন সেই বয়ান সামাজিক স্বীকৃতি পায়।

এখানেই দুর্নীতির আরেকটি দিক প্রকাশ পায়—নির্বাচনী নৈতিকতা। ইউনুস প্রশাসনের সময় কিছু ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়া হলেও, মৌলবাদী বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ছিল একধরনের সতর্কতা। এই সতর্কতা কি কেবল সংবেদনশীলতার কারণে, নাকি রাজনৈতিক সুবিধার হিসাব ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কিন্তু ফলাফল স্পষ্ট—একটি অসম প্রয়োগের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

দুর্নীতির এই নতুন ভাষা সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়েছে বিচারবিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষেত্রে। মৌলবাদী হুমকি, ঘৃণামূলক বক্তব্য বা সামাজিক নৈরাজ্যের ঘটনায় বিচারিক অগ্রগতি ছিল সীমিত। প্রশাসন অনেক সময় পরিস্থিতি “শান্ত” রাখতে চেয়েছে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নয়। এই শান্তি ছিল কৃত্রিম, কারণ এটি সমস্যার মূলকে স্পর্শ করেনি।

এই নীতিগত দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—নারী, সংখ্যালঘু, LGBTQ+ নাগরিকরা—তারা বুঝেছে, রাষ্ট্র তাদের জন্য দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে না। এই উপলব্ধি সামাজিক আস্থাকে ভেঙে দেয়। মানুষ যখন রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা বিকল্প কর্তৃত্ব খোঁজে। মৌলবাদ এই শূন্যতা পূরণ করে।

ইউনুস প্রশাসনের সময় দুর্নীতির ভাষা এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে অনেকেই প্রথমে তা বুঝতে পারেনি। কারণ এখানে বড় কেলেঙ্কারি, দৃশ্যমান লুটপাট বা নাটকীয় ঘটনা কম ছিল। কিন্তু নীরবতার মধ্য দিয়েই একটি বিপজ্জনক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—রাষ্ট্র তার নৈতিক সীমারেখা আলগা করেছে।

এই আলগা সীমারেখার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। মৌলবাদী শক্তিগুলো এখন আর নিজেদের প্রান্তিক মনে করে না। তারা জানে—রাষ্ট্র দ্ব্যর্থক, প্রশাসন আপসপ্রবণ। এই আত্মবিশ্বাসই ভবিষ্যতের বড় নৈরাজ্যের বীজ।

এই প্রেক্ষাপটে ইউনুস প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো—তারা নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করে নৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে এসেছে। রাষ্ট্র পরিচালনা মানে শুধু ভালো উদ্দেশ্য থাকা নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা মানে কঠিন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। মৌলবাদের ক্ষেত্রে সেই কঠোরতা দেখানো হয়নি।

বাংলাদেশ আজ যে সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এই নীতিগত দুর্নীতির হিসাব একদিন না একদিন দিতেই হবে। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন করে—কোনো প্রশাসন কী বলেছিল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোনো প্রশাসন কী করেনি

এই লেখা সেই না-করা কাজগুলোর একটি নীরব তালিকা। আর এই তালিকাই আমাদের ভবিষ্যৎ বুঝতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশ কোন পথে—ধর্মরাষ্ট্র, ব্যর্থ রাষ্ট্র নাকি পুনর্গঠনের শেষ সুযোগ?

লিখেছেন- আবদুল্লাহ আল হোসাইন

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সন্ধিক্ষণ কোনো একক রাজনৈতিক ঘটনার ফল নয়; এটি বহু বছরের জমে ওঠা সংকটের পরিণতি। প্রশ্নটি এখন আর শুধু কে ক্ষমতায় আছে বা কে আসবে—সেই সীমায় আটকে নেই। প্রশ্নটি আরও গভীর: বাংলাদেশ কোন পথে এগোচ্ছে? একটি ধর্মরাষ্ট্রের দিকে? একটি কার্যত ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে? নাকি এখনও পুনর্গঠনের শেষ একটি সুযোগ আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে—রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিচারবিভাগের অকার্যকারিতা, প্রশাসনিক দ্ব্যর্থকতা, দুর্নীতির নীতিগত রূপ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এই দুর্বলতার সুযোগই নিচ্ছে সংগঠিত আদর্শিক শক্তিগুলো, বিশেষ করে ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী।

ধর্মরাষ্ট্রের ধারণা বাংলাদেশে নতুন নয়, কিন্তু এটি কখনোই রাষ্ট্রীয় নীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংবিধান, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—সবকিছুই একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা যখন বাড়ে, তখন ধর্মীয় রাজনীতি শূন্যস্থান পূরণ করতে চায়। এটি সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ দিয়ে।

ইউনুস প্রশাসনের সময় এই প্রক্রিয়াটি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। প্রশাসন ধর্মীয় মৌলবাদকে মোকাবিলা করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে ম্যানেজ করার কৌশল বেছে নিয়েছে। যুক্তি ছিল—সংঘাত এড়ানো, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। কিন্তু এই কৌশল মৌলবাদী শক্তিগুলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে: রাষ্ট্র আপসপ্রবণ। এই বার্তা থেকেই ধর্মীয় রাজনীতি আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

ধর্মরাষ্ট্রের পথে যাওয়ার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো—আইনের ঊর্ধ্বে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। যখন কোনো গোষ্ঠী বলে, তাদের ধর্মীয় ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত নৈতিক মানদণ্ড, তখন রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারব্যবস্থা গৌণ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এই প্রবণতা বাড়ছে—নারীর পোশাক, মতপ্রকাশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও ধর্মীয় ভাষায় ফতোয়া-সদৃশ বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্র যখন এসবের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয় না, তখন ধর্মরাষ্ট্রের ধারণা শক্তি পায়।

অন্যদিকে আছে ব্যর্থ রাষ্ট্রের সম্ভাবনা। ব্যর্থ রাষ্ট্র মানে শুধু অর্থনৈতিক পতন নয়; এর মানে রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ। নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সমান অধিকার—এই তিনটি যদি নিশ্চিত না হয়, তবে রাষ্ট্র কার্যত ব্যর্থ। বাংলাদেশে এই তিন ক্ষেত্রেই সংকট দেখা যাচ্ছে। আইন প্রয়োগে অসমতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা—সবই ব্যর্থ রাষ্ট্রের লক্ষণ।

ইউনুস প্রশাসনের সময় এই লক্ষণগুলো আরও প্রকট হয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করে প্রশাসন কঠিন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে গেছে। মৌলবাদী চাপের মুখে আপস করা হয়েছে, বিচারিক সংস্কার পিছিয়েছে, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত থেকেছে। এই সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এই দুই বিপদের মাঝখানে আছে পুনর্গঠনের শেষ সুযোগ। এই সুযোগ এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পুনর্গঠন মানে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ। এর জন্য প্রয়োজন কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ।

প্রথমত, রাষ্ট্রকে মৌলবাদ বিষয়ে স্পষ্ট ও নীতিগত অবস্থান নিতে হবে। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস—এই নীতিতে কোনো আপস করা যাবে না। ধর্মীয় রাজনীতি, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে দ্ব্যর্থকতা বন্ধ করতে হবে। এখানে কোনো “ম্যানেজমেন্ট” চলবে না।

দ্বিতীয়ত, বিচারবিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কার্যকর করতে হবে। বিচারিক সংস্কার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ক্ষয় হতে থাকে, আর সেই শূন্যতা পূরণ করে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি।

তৃতীয়ত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারী, সংখ্যালঘু, LGBTQ+ নাগরিকরা যদি রাষ্ট্রের সুরক্ষা না পায়, তাহলে রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়। এই সুরক্ষা শুধু কথায় নয়; আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে দৃশ্যমান হতে হবে।

চতুর্থত, তরুণ সমাজকে আবার রাজনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। কর্মসংস্থান, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিশ্বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ—এই তিনটি ছাড়া তরুণদের হতাশা কাটবে না। হতাশ তরুণ সমাজ মানেই চরমপন্থার উর্বর জমি।

এই সবকিছু বাস্তবায়ন করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, সংকটের মধ্যেই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ পায়। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি সেই সুযোগ গ্রহণ করবে, নাকি নীরবতা ও আপসের পথেই এগোবে?

ধর্মরাষ্ট্র ও ব্যর্থ রাষ্ট্র—দুটোই ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। প্রথমটি ব্যক্তিস্বাধীনতা ধ্বংস করে, দ্বিতীয়টি নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারকে বিলুপ্ত করে। পুনর্গঠনের পথ কঠিন, কিন্তু একমাত্র টেকসই পথ।

বাংলাদেশের সামনে এখন আর সময় নেই বিলম্ব করার। প্রতিটি আপস, প্রতিটি নীরবতা রাষ্ট্রকে এক ধাপ করে পিছিয়ে দিচ্ছে। এই ব্লগ কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়; এটি একটি সতর্কতা। রাষ্ট্র কোন পথে যাবে, তা নির্ধারিত হবে আজকের সিদ্ধান্তে।

সামনে কী? অন্ধকার ভবিষ্যৎ না কি শেষবারের মতো রাষ্ট্রকে বাঁচানোর লড়াই

লিখেছেন- এমডি যোবায়ের হোসেন

এখন আর ভদ্র ভাষায় কথা বলার সময় নেই।
বাংলাদেশ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে গোলাপি শব্দ, নৈতিক বক্তৃতা আর “সংলাপের আহ্বান” কেবল সময় নষ্ট করার অজুহাত। রাষ্ট্র ধ্বংস হয় তখনই, যখন ক্ষমতাসীনরা সমস্যার নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়। বাংলাদেশ আজ ঠিক সেই জায়গায়।

আমরা একটি ধীরে ধীরে পচে যাওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখছি—যেখানে দুর্নীতি শুধু টাকা নয়, নীতির স্তরে ঢুকে পড়েছে; যেখানে মৌলবাদ শুধু মসজিদে নয়, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তহীনতায় জায়গা করে নিয়েছে; যেখানে প্রশাসন শক্ত নয়, বরং সুবিধাবাদী; আর যেখানে নৈতিকতার কথা বলা লোকেরাই সবচেয়ে বড় নৈতিক ব্যর্থতার অংশ।

ইউনুস প্রশাসনের সময় সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হয়েছে, তা হলো—মৌলবাদের সঙ্গে সংঘাতকে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া। এই এড়িয়ে যাওয়াকে তারা নাম দিয়েছে সহনশীলতা, সংলাপ, স্থিতিশীলতা। বাস্তবে এটি ছিল রাষ্ট্রীয় কাপুরুষতা। মৌলবাদ কখনো সংলাপের ভাষা বোঝে না। মৌলবাদ বোঝে শক্তি, সীমা আর পরিণতি। রাষ্ট্র যখন এই তিনটিই দেখাতে ব্যর্থ হয়, তখন মৌলবাদ রাষ্ট্রের ঘাড়ে চড়ে বসে।

আজ বাংলাদেশে ধর্মের নামে যা হচ্ছে, তা ধর্ম নয়—এটি ক্ষমতার রাজনীতি। নারীকে নিয়ন্ত্রণ, সংখ্যালঘুকে চুপ করানো, LGBTQ+ জনগোষ্ঠীকে অমানুষ করা, শিল্প-সংস্কৃতিকে ভয় দেখানো—এসবের কোনোটাই ধর্মীয় সাধনা নয়। এগুলো রাজনৈতিক আধিপত্যের কৌশল। আর রাষ্ট্র যখন এসবের বিরুদ্ধে কঠোর হয় না, তখন সে নিজেই অপরাধের অংশীদার হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই নৈরাজ্য এখন আর প্রান্তিক নয়। এটি মূলধারায় ঢুকে গেছে। টিভি টকশোতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে, ওয়াজের মঞ্চে—ঘৃণার ভাষা এখন স্বাভাবিক। আর প্রশাসন কী করছে? “পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ।” এই পর্যবেক্ষণই ইতিহাসে লেখা হবে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দলিল হিসেবে।

দুর্নীতির কথাও কড়া ভাষায় বলতে হবে। ইউনুস প্রশাসনের সময় দুর্নীতি ছিল না—এই কথা বলা একটি নির্লজ্জ মিথ্যা। দুর্নীতি ছিল, তবে তা ছিল পরিষ্কার হাতের, নোংরা সিদ্ধান্তের দুর্নীতি। নীতিগত আপস, নির্বাচনী নীরবতা, সুবিধাজনক অন্ধত্ব—এই সবই দুর্নীতি। মৌলবাদী শক্তিকে খুশি রাখতে গিয়ে যদি রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক দায়িত্ব ভুলে যায়, সেটি দুর্নীতিই।

এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে বিচারব্যবস্থা। বিচার নেই, আছে শুধু মামলা ঝুলিয়ে রাখার নাটক। ক্ষমতাবানদের জন্য আইন নরম, দুর্বলদের জন্য কঠোর। মৌলবাদী হুমকি, ঘৃণামূলক বক্তব্য, সামাজিক সহিংসতা—এসবের বিচার না হওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি প্যাটার্ন। এই প্যাটার্নের নাম বিচারহীনতার সংস্কৃতি

আর এই সংস্কৃতির সবচেয়ে সহজ শিকার হচ্ছে তারা, যাদের রাষ্ট্র সবচেয়ে কম রক্ষা করে—নারী, সংখ্যালঘু, LGBTQ+ নাগরিকরা। এদের নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্র কার্যত হাত গুটিয়ে বসে আছে। প্রশাসন ভাবে—এরা “সংবেদনশীল ইস্যু।” না, এরা সংবেদনশীল ইস্যু নয়; এরা নাগরিক। রাষ্ট্র যদি নাগরিক বাছাই করে সুরক্ষা দেয়, তাহলে সে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না—সে হয়ে ওঠে একটি পক্ষপাতদুষ্ট শক্তি।

এখন প্রশ্ন—সামনে কী?

একটি পথ খুব পরিষ্কার। সেই পথে গেলে বাংলাদেশ হবে একটি ধর্মীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত, নৈতিক পুলিশে ভরা, ভয়ভিত্তিক সমাজ। সেখানে আইন নয়, ফতোয়া চলবে; বিচার নয়, জনরোষ চলবে; রাষ্ট্র নয়, গোষ্ঠী শাসন করবে। এই পথের শেষ কোথায়—ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে।

আরেকটি পথও আছে। সেটি কঠিন, অস্বস্তিকর, এবং সাহস দাবি করে। এই পথ মানে—মৌলবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান। এই পথ মানে—ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে সম্মান করা, কিন্তু ধর্মীয় রাজনীতিকে কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা। এই পথ মানে—বিচারব্যবস্থা সংস্কার, প্রশাসনিক শক্তি পুনর্গঠন, এবং দুর্নীতির নৈতিক মুখোশ ছিঁড়ে ফেলা।

এই পথ মানে—ভদ্রতার ভান বাদ দিয়ে সত্য বলা। মৌলবাদকে মৌলবাদ বলা। নীরবতাকে অপরাধ বলা। আপসকে দুর্নীতি বলা।

এখন আর “সময় দরকার” বলা চলবে না। সময় শেষ। প্রতিটি দিন রাষ্ট্রকে আরও দুর্বল করছে। প্রতিটি নীরবতা মৌলবাদকে আরও সাহসী করছে। প্রতিটি আপস ভবিষ্যৎকে আরও অন্ধকার করছে।

এই ব্লগ সিরিজের শেষ কথাটি সোজাসাপ্টা:
বাংলাদেশ বাঁচবে না যদি আমরা ভদ্র থাকি।
বাংলাদেশ বাঁচবে যদি আমরা সৎভাবে কঠোর হই

রাষ্ট্র রক্ষা করতে হলে এখন আর কাউকে খুশি করার রাজনীতি নয়—সঠিক কাজ করার রাজনীতি দরকার। এই কাজ জনপ্রিয় নাও হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস জনপ্রিয়তা দেখে না—ইতিহাস দেখে কে ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

এটাই শেষ সুযোগ।
এর পরে আর কলাম লেখার সুযোগ নাও থাকতে পারে—কারণ তখন হয়তো লেখাই অপরাধ হয়ে যাবে।

ধীরে ধীরে ধ্বংস: ইউনুস প্রশাসনের সময় ইসলামী মৌলবাদ কীভাবে রাষ্ট্রের ভিত নড়িয়ে দিচ্ছে

লিখেছেন-মোহাম্মদ আল মামুর

বাংলাদেশ আজ যেটুকু দাঁড়িয়ে আছে, সেটুকু কোনো আকস্মিক বিপর্যয়ের ফল নয়। এটি একটি ধীর ক্ষয়প্রক্রিয়ার পরিণতি। এই ক্ষয় চোখে পড়ে না প্রথমে, শব্দ করে না, বিস্ফোরণ ঘটায় না—কিন্তু ভিতর থেকে রাষ্ট্রের কাঠামো দুর্বল করে দেয়। ইউনুস প্রশাসনের সময় ইসলামী মৌলবাদের উত্থান ঠিক এই ধরণের একটি ধীর, পরিকল্পিত এবং বিপজ্জনক ক্ষয়ের রূপ নিয়েছে—এমনটাই মনে করেন বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এই ক্ষয়ের শুরুটা হয়েছে নামকরণ এড়িয়ে যাওয়া দিয়ে। মৌলবাদকে মৌলবাদ বলা হয়নি। তাকে বলা হয়েছে “ধর্মীয় সংবেদনশীলতা”, “সামাজিক বাস্তবতা”, “প্রান্তিক মতাদর্শ”। রাষ্ট্র যখন কোনো সমস্যার নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়, তখন সেই সমস্যা আরও শক্তিশালী হয়। ইউনুস প্রশাসনের সময় ঠিক এই ভয়টাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামী মৌলবাদ কখনোই শুধু ধর্মীয় চর্চার প্রশ্ন নয়। এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প—যার লক্ষ্য সমাজ ও রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক ছাঁচে ঢেলে দেওয়া। এই প্রকল্প প্রথমে আইন ভাঙে না; প্রথমে সে নৈতিকতা দখল করে। কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না; কী পরা যাবে, কী পরা যাবে না; কে ভালো মানুষ, কে “পথভ্রষ্ট”—এই শ্রেণিবিভাগ দিয়েই মৌলবাদ সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

ইউনুস প্রশাসনের সময় এই নৈতিক দখলদারির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান ছিল অস্পষ্ট। প্রশাসন বারবার বলেছে—তারা ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করতে চায় না। কিন্তু রাষ্ট্রের কাজ অনুভূতি রক্ষা করা নয়; রাষ্ট্রের কাজ অধিকার রক্ষা করা। এই পার্থক্যটি উপেক্ষা করার ফলেই মৌলবাদ ধীরে ধীরে সামাজিক বৈধতা পেতে শুরু করেছে।

এই বৈধতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। মৌলবাদী বক্তৃতা ও প্রচারে নারীর স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান, পোশাক ও মতপ্রকাশকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। LGBTQ+ জনগোষ্ঠীকে উপস্থাপন করা হয়েছে “নৈতিক বিপদ” হিসেবে। সংখ্যালঘুদের অস্তিত্বকে করা হয়েছে সন্দেহজনক। রাষ্ট্র যখন এসব বয়ানের বিরুদ্ধে কঠোর হয় না, তখন তা সামাজিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।

এই সময়টিতে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা গেছে—বিচারহীনতা। মৌলবাদী হুমকি, ঘৃণামূলক বক্তব্য বা সামাজিক নৈরাজ্যের ঘটনায় বিচার না হওয়া কাকতালীয় নয়। এটি একটি ধারাবাহিক বার্তা দেয়—এই কাজগুলোর শাস্তি নেই। ইউনুস প্রশাসনের সময় “পরিস্থিতি শান্ত রাখা”র নামে অনেক ক্ষেত্রেই আইনি ব্যবস্থা দুর্বল ছিল—এমন অভিযোগ করেছেন সমালোচকেরা।

এই বিচারহীনতা মৌলবাদকে আরও সাহসী করেছে। কারণ তারা জানে—রাষ্ট্র দ্বিধাগ্রস্ত, প্রশাসন আপসপ্রবণ। এই পরিস্থিতিতে মৌলবাদ আর প্রান্তিক থাকে না; সে হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাসী। আর আত্মবিশ্বাসী মৌলবাদ মানেই রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি।

ধীরে ধীরে এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের ভিত নড়িয়ে দেয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম—সব জায়গায় আত্মনিয়ন্ত্রণ বা self-censorship শুরু হয়। মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়। লেখক ভাবেন—এটা লিখলে সমস্যা হবে কি না। শিক্ষক ভাবেন—এই বিষয় পড়ালে বিতর্ক হবে কি না। এই ভয়ই মৌলবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

ইউনুস প্রশাসনের সময় এই ভয়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাঙার কোনো দৃঢ় প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। নৈতিকতার ভাষা ছিল, কিন্তু শক্তির ভাষা ছিল না। অথচ ইতিহাস বলে—মৌলবাদ নৈতিকতার ভাষা বোঝে না; সে বোঝে সীমা।

এই সীমা না টানার ফল বাংলাদেশ আজ দিতে শুরু করেছে। রাষ্ট্র হয়তো এখনো ভেঙে পড়েনি, কিন্তু তার ভিত দুর্বল। আর ভিত দুর্বল হলে পতন কেবল সময়ের ব্যাপার।


মুহাম্মদ ইউনুসের শাসন: নৈতিকতার মুখোশের আড়ালে এক ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় ভাঙন

লিখেছেন- জাহেদ আহমেদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু শাসন আছে, যেগুলো ক্ষমতায় আসার সময় “নৈতিকতা”, “সংস্কার” ও “উদ্ধার”-এর বুলি আউড়ে শুরু হয়, কিন্তু সময় গড়াতে গড়াতে সেই নৈতিকতার মুখোশের আড়ালেই জন্ম নেয় ভয়ংকর দমননীতি। মুহাম্মদ ইউনুসের শাসন সেই ভয়ংকর উদাহরণগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

প্রথম দিকে ইউনুস নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন একজন “অরাজনৈতিক”, “মানবিক” ও “সংস্কারক” চরিত্র হিসেবে। বলা হয়েছিল, তিনি নাকি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়বেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্র কোনো এনজিও নয়, আর দেশ চালানো কোনো মাইক্রোক্রেডিট প্রকল্প নয়। রাষ্ট্র চালাতে লাগে জবাবদিহি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসন। এই তিনটির কোনোটিই ইউনুসের শাসনে দৃশ্যমান হয়নি।

ক্ষমতায় এসেই ইউনুস প্রথম যে কাজটি করেন, তা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন ভেঙে ফেলা। প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা ক্রমশ তাঁর ব্যক্তিগত আস্থাভাজনদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। ফলে আইনের শাসন নয়, চালু হয় “কে ইউনুসের লোক”—এই প্রশ্নের রাজনীতি।

আইনশৃঙ্খলার অবনতি শুরু হয় খুব দ্রুত। থানায় সাধারণ মানুষ আর ন্যায়বিচার পায় না। মামলা নেয়া হয় রাজনৈতিক পরিচয় দেখে। অপরাধীরা ধরা পড়ে না, যদি তারা শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ হয়। অথচ বিরোধী মতের মানুষদের বিরুদ্ধে মামলার পাহাড় তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র কার্যত একটি নির্বাচিত দমনযন্ত্রে পরিণত হয়।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—ইউনুসের শাসনে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাংবাদিকরা লিখতে ভয় পায়। শিক্ষকরা কথা বলতে ভয় পায়। সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করলেই ডিজিটাল নজরদারি, হয়রানি কিংবা গ্রেপ্তারের আশঙ্কা তৈরি হয়। রাষ্ট্র যখন নাগরিককে ভয় দেখায়, তখন সেই রাষ্ট্র আর গণতান্ত্রিক থাকে না।

ইউনুসের শাসন দেখিয়েছে—নৈতিকতার বুলি ব্যবহার করে কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে দমনমূলক কাঠামোয় রূপান্তর করা যায়। এটি শুধু ব্যর্থ শাসন নয়; এটি একটি নৈতিক প্রতারণা।

আইন নেই, ন্যায় নেই: ইউনুস আমলে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার পতনের দলিল

লিখেছেন-আফরোজা আলীম আশা

যে রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, সে রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন কেবল অনিশ্চিত নয়—ভয়ংকর হয়ে ওঠে। মুহাম্মদ ইউনুসের শাসনামলে বাংলাদেশ ঠিক সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

একসময় বলা হতো, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হলেও রাষ্ট্র অন্তত একটি কাঠামোর মধ্যে আছে। ইউনুসের সময় সেই কাঠামোই ভেঙে পড়েছে। পুলিশ আর জনগণের নিরাপত্তার বাহিনী নয়; তারা শাসকের রাজনৈতিক হাতিয়ার। অপরাধ দমনের বদলে পুলিশ ব্যস্ত হয়ে পড়ে ভিন্নমত দমনে।

খুন, ডাকাতি, সাম্প্রদায়িক হামলা—সবকিছু বেড়েছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো নির্বাচিত নীরবতা। অনেক ঘটনায় রাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে চুপ থাকে। কেন? কারণ অপরাধীরা রাজনৈতিকভাবে “উপযোগী”।

ইউনুসের শাসনে বিচারব্যবস্থা কার্যত অচল। মামলার রায় আসে না, আসে বছরের পর বছর পরে। অথচ রাজনৈতিক মামলায় রাতারাতি রায় হয়। এই দ্বিচারিতা রাষ্ট্রের ওপর মানুষের শেষ বিশ্বাসটুকুও ভেঙে দেয়।

আইনশৃঙ্খলার এই পতনের সরাসরি ফল হচ্ছে—

  • মানুষ নিজের নিরাপত্তা নিজে খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে
  • সামাজিক সংঘর্ষ বাড়ছে
  • উগ্র গোষ্ঠীগুলো সাহস পাচ্ছে

রাষ্ট্র যখন শক্তি প্রয়োগে পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তখন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ইউনুসের শাসন এই ভয়ংকর বাস্তবতার দিকেই বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছে।

সংস্কারক থেকে দানব: ক্ষমতা কীভাবে মুহাম্মদ ইউনুসকে বদলে দিল

লিখেছেন-সৈয়দ আরিফ মাসুদ

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—ক্ষমতা মানুষকে বদলায় না, বরং মানুষ আসলে কে, সেটাই উন্মোচন করে। যারা ক্ষমতার আগে নিজেদের নৈতিক, মানবিক বা নিরপেক্ষ বলে দাবি করে, ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছানোর পর তাদের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায় সবচেয়ে নির্মমভাবে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে মুহাম্মদ ইউনুস সেই নির্মম সত্যের একটি ভয়াবহ উদাহরণ।

একসময় যিনি “সংস্কারক”, “নৈতিক বিকল্প”, “রাজনীতির বাইরে থাকা একজন মানবিক মুখ” হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিলেন, ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে তিনি পরিণত হয়েছেন এক ভয়ংকর, অসহিষ্ণু ও নিয়ন্ত্রণকামী শাসকে। এই রূপান্তর হঠাৎ ঘটেনি। এটি ছিল ধাপে ধাপে, পরিকল্পিত এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সংঘটিত একটি রূপান্তর।

এই লেখাটি ইউনুসকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার জন্য নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ—কীভাবে ক্ষমতা, অহংকার এবং জবাবদিহিহীনতা একজন “সংস্কারক”-কে দানবে পরিণত করে।


১. নৈতিকতার মুখোশ: ইউনুসের উত্থানের গল্প

মুহাম্মদ ইউনুসের ক্ষমতায় আসার পথটি ছিল কৌশলী ও সুচারু। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আসেননি। বরং নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন একজন “রাষ্ট্রের বাইরে থাকা” মানুষ হিসেবে—যিনি নাকি পুরোনো রাজনীতির কলুষতা থেকে মুক্ত। এই কৌশলটি অত্যন্ত কার্যকর ছিল। কারণ বাংলাদেশের জনগণ বহুদিন ধরে রাজনৈতিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দলীয় দখলদারিত্বে ক্লান্ত। সেই ক্লান্তির সুযোগ নিয়েই ইউনুস নিজেকে বিকল্প হিসেবে দাঁড় করান। কিন্তু এখানেই ছিল প্রথম প্রতারণা। রাষ্ট্র কোনো নৈতিক বক্তৃতার মঞ্চ নয়। রাষ্ট্র চালাতে হয় কঠোর বাস্তবতায়, যেখানে সিদ্ধান্তের দায় নিতে হয় এবং ভুলের জবাব দিতে হয়। ইউনুস এই বাস্তবতা কখনোই স্বীকার করেননি।


২. ক্ষমতায় এসেই প্রথম আঘাত: প্রতিষ্ঠান ধ্বংস

ক্ষমতায় আসার পর ইউনুস যে কাজটি সবচেয়ে দ্রুত করেছেন, তা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য নষ্ট করা। প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা—সব জায়গায় তিনি নিজের আস্থাভাজনদের বসাতে শুরু করেন। যোগ্যতা নয়, আনুগত্য হয়ে ওঠে প্রধান মানদণ্ড। ফলে যা ঘটে—

  • প্রশাসন স্বাধীন থাকে না
  • পুলিশ আইন মানে না, আদেশ মানে
  • বিচারব্যবস্থা ন্যায় নয়, সুবিধা দেখে

এই পর্যায়ে ইউনুস নিজেকে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেন। তিনি বুঝে যান—যদি প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে, তবে তিনিই হবেন একমাত্র শক্তিশালী কেন্দ্র।

এটাই দানবীয় শাসনের প্রথম লক্ষণ।


৩. সমালোচনার প্রতি শূন্য সহনশীলতা

একজন প্রকৃত সংস্কারক সমালোচনাকে স্বাগত জানায়। কিন্তু ইউনুসের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা। ক্ষমতার কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল—

  • সাংবাদিকদের ওপর চাপ
  • সমালোচক শিক্ষকদের বদলি
  • সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি
  • ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে মামলা

ইউনুস ধীরে ধীরে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন—
“আমার সমালোচনা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা।”

এই ধারণা যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্র শেষ হয়ে যায়।


৪. ভয়কে রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপান্তর

ইউনুসের শাসনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—তিনি ভয়কে একটি কার্যকর শাসনপদ্ধতিতে রূপান্তর করেছেন। মানুষ এখন আর সরাসরি বিরোধিতা করে না। তারা চুপ থাকে। তারা আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-censorship) করে। এই নীরবতাই ইউনুসের সবচেয়ে বড় সাফল্য। শিক্ষক ক্লাসে কিছু বিষয় এড়িয়ে যান। সাংবাদিক কিছু শব্দ ব্যবহার করেন না। শিল্পী কিছু আঁকেন না।

রাষ্ট্র যখন নাগরিককে চুপ করিয়ে দেয়, তখন আর বন্দুক দরকার হয় না।


৫. আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ পতন

ইউনুসের শাসনে আইনশৃঙ্খলা শুধু দুর্বল হয়নি—এটি নির্বাচিতভাবে প্রয়োগ হয়েছে।

  • ক্ষমতাসীনদের অপরাধ উপেক্ষিত
  • বিরোধীদের ছোট ভুলেও মামলা
  • সহিংস গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নীরবতা
  • সাধারণ মানুষের জন্য কোনো নিরাপত্তা নেই

এতে উগ্র গোষ্ঠীগুলো সাহস পায়। কারণ তারা জানে—রাষ্ট্র প্রয়োজনে চোখ বন্ধ করবে।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র নিজেই অপরাধের সহযোগী হয়ে ওঠে।


৬. দানবীয় শাসনের মনস্তত্ত্ব

দানবীয় শাসকের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে—
তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে পারে না।

ইউনুসও পারেন না।
সমস্যা হলে দোষ পড়ে—

  • বিরোধীদের ওপর
  • “বিদেশি ষড়যন্ত্র”-এর ওপর
  • “রাষ্ট্রবিরোধী চক্র”-এর ওপর

এই দায় এড়ানোর প্রবণতা তাকে আরও নিষ্ঠুর করে তোলে।


৭. ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাষ্ট্র: সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়

সবচেয়ে ভয়ংকর পর্যায়ে ইউনুস নিজেকে রাষ্ট্রের সমার্থক বানান।

তার সিদ্ধান্ত মানেই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত।
তার সমালোচনা মানেই দেশের শত্রুতা।

এই অবস্থায় রাষ্ট্র আর নাগরিকের নয়—রাষ্ট্র হয়ে ওঠে একজন মানুষের সম্পত্তি।


৮. ভবিষ্যৎ পরিণতি: বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে?

এই শাসন চলতে থাকলে বাংলাদেশের সামনে তিনটি ভয়ংকর ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে আছে—

১. স্থায়ী ভয়ের সমাজ
২. মেধাপলায়ন ও নীরবতা
৩. উগ্রবাদীদের উত্থান

ইতিহাস বলে—এ ধরনের শাসন একদিন ভেঙে পড়ে। কিন্তু তার আগে সমাজের ভিত ভেঙে যায়।


উপসংহার: ইতিহাস ক্ষমা করে না

মুহাম্মদ ইউনুস হয়তো নিজেকে এখনো সংস্কারক ভাবেন। কিন্তু ইতিহাস তাকে বিচার করবে তার কাজ দিয়ে, কথায় নয়।

ক্ষমতা তাকে বদলে দিয়েছে—নাকি তার আসল রূপ উন্মোচিত করেছে—এই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস দেবে।

একটি বিষয় নিশ্চিত—
যে শাসন ভয় দিয়ে টিকে থাকে, সে শাসন শেষ পর্যন্ত নিজেরই তৈরি দানবের নিচে চাপা পড়ে।

মুহাম্মদ ইউনুসের শাসন: নৈতিক মুখোশের আড়ালে এক ভয়ংকর অপশাসনের নির্মাণ

লিখেছেন- মোহাম্মদ জাহিন

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু শাসন আসে বজ্রপাতের মতো—চোখে পড়ে, শব্দ করে, ধ্বংস করে। আবার কিছু শাসন আসে নীরবে, নৈতিকতার মুখোশ পরে, “ভালোর জন্য” কথার আড়ালে। মুহাম্মদ ইউনুসের শাসন দ্বিতীয় প্রকারের। এটি এমন এক শাসন, যা বন্দুক উঁচিয়ে ক্ষমতা দখল করেনি, কিন্তু রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ধীরে ধীরে ভেঙে দিয়েছে। এটি এমন এক শাসন, যা “নৈতিকতা”, “সুশাসন”, “সংস্কার” শব্দগুলোকে অস্ত্র বানিয়ে গণতন্ত্রকে অচল করেছে, আইনশৃঙ্খলাকে ভেঙে দিয়েছে এবং রাষ্ট্রকে এক গভীর অনিশ্চয়তার খাদে ঠেলে দিয়েছে।

ইউনুসের শাসন কোনো সামরিক জান্তার মতো সরাসরি দমন-পীড়নের শাসন নয়। এটি আরও বিপজ্জনক। কারণ এটি নৈতিক ভণ্ডামির শাসন। এখানে রাষ্ট্র ভাঙে বক্তৃতায়, প্রশাসন ভাঙে সিদ্ধান্তহীনতায়, সমাজ ভাঙে ভয়ের নীরবতায়।

১. নৈতিকতার মুখোশ: যেখানে রাজনীতি অস্বীকারই রাজনীতি

ইউনুস নিজেকে বরাবরই “রাজনীতির বাইরে” মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু ইতিহাস জানে—রাজনীতির বাইরে থাকার দাবি অনেক সময় সবচেয়ে ভয়ংকর রাজনৈতিক অবস্থান। কারণ এখানে কোনো জবাবদিহি নেই। ভোট নেই। সংসদ নেই। বিরোধী দল নেই। আছে কেবল “আমি ভালো জানি”—এই একনায়কসুলভ ধারণা।

ইউনুসের শাসনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে এখানেই। তিনি রাজনীতিকে অশুদ্ধ বলে বাতিল করেছেন, অথচ নিজে রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। এই দ্বিচারিতাই শাসনের ভিত্তি।

গণতন্ত্রে ভুল শাসককে সরানোর পথ থাকে। ইউনুসের শাসনে সেই পথই বন্ধ। কারণ তিনি নির্বাচিত নন, অথচ ক্ষমতাবান। তিনি দায়বদ্ধ নন, অথচ সিদ্ধান্ত নেন। এটি সরাসরি গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক।

২. আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ পতন: রাষ্ট্র যখন নিষ্ক্রিয় দর্শক

ইউনুসের শাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল হলো আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি। রাষ্ট্র এখন আর নাগরিককে রক্ষা করে না; রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।

সড়কে মব জাস্টিস। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হয়রানি। সাংবাদিকদের ভয় দেখানো। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের হেনস্তা। পুলিশ নীরব। প্রশাসন দ্বিধাগ্রস্ত। আর শাসক? বক্তৃতায় ব্যস্ত।

একটি রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে শাসককে দায় নিতে হয়। ইউনুস সেই দায় নেন না। তিনি সবকিছুকে “ট্রানজিশনাল চ্যালেঞ্জ” বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু চ্যালেঞ্জ আর অবহেলার মধ্যে পার্থক্য আছে। এখানে যা চলছে, তা অবহেলা—রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সরাসরি পরিত্যাগ।

৩. প্রশাসনিক পঙ্গুত্ব: সিদ্ধান্তহীনতার স্বৈরতন্ত্র

ইউনুসের শাসনে প্রশাসন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ এখানে নির্দেশ আসে না স্পষ্টভাবে। আসে অস্পষ্ট ইঙ্গিতে। ফলে আমলারা সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়। কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। সবাই অপেক্ষা করে—“উপর থেকে কী আসে?”

এই ভয়ভিত্তিক প্রশাসন কোনো রাষ্ট্র চালাতে পারে না। এর ফল হয় অচলাবস্থা। ফাইল আটকে থাকে। তদন্ত থেমে যায়। অপরাধীরা বুঝে যায়—এখন সময়টা নিরাপদ।

ইউনুসের শাসন প্রশাসনকে দক্ষ করেনি; প্রশাসনকে ভীতু বানিয়েছে।

৪. মৌলবাদী শক্তির উত্থান: নীরব সম্মতির রাজনীতি

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—ইউনুসের শাসনে উগ্র ইসলামবাদীরা নতুন সাহস পেয়েছে। এটি সরাসরি সমর্থনের কারণে নয়, বরং নীরবতার কারণে

যখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়, রাষ্ট্র স্পষ্ট ভাষায় নিন্দা করে না। যখন নারীর অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, রাষ্ট্র দ্ব্যর্থক থাকে। যখন ব্লাসফেমি অভিযোগে মানুষ হুমকির মুখে পড়ে, রাষ্ট্র বলে—“সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে হবে।”

এই ভাষাই উগ্রবাদীদের বার্তা দেয়—“তোমরা এগিয়ে যাও, রাষ্ট্র থামাবে না।”

ইউনুসের শাসনে রাষ্ট্র কার্যত একটি পক্ষ বেছে নিয়েছে—ভয়ের পক্ষ।

৫. ভয়ের সংস্কৃতি: আত্মনিয়ন্ত্রণই নতুন নাগরিকত্ব

আজ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—মানুষ কথা বলতে ভয় পায়। এটি বন্দুকের ভয় নয়; এটি অনিশ্চয়তার ভয়।

সাংবাদিক জানে না কোন লেখা তাকে বিপদে ফেলবে। শিক্ষক জানে না কোন বক্তব্যে তাকে টার্গেট করা হবে। নাগরিক জানে না তার পরিচয় কখন অপরাধ হয়ে যাবে।

এই ভয়ই অপশাসনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ যেখানে মানুষ নিজে নিজে চুপ হয়ে যায়, সেখানে আর সেন্সরশিপের দরকার পড়ে না।

৬. রাষ্ট্রের নৈতিক পতন: যখন ভালো মানুষ থাকা অপরাধ

ইউনুসের শাসনে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—নৈতিকতার সংজ্ঞা উল্টে গেছে। এখন নৈতিক হওয়া মানে প্রশ্ন না করা। নৈতিক হওয়া মানে অন্যায় দেখেও চুপ থাকা। নৈতিক হওয়া মানে ক্ষমতার মুখে নতজানু হওয়া।

এই শাসন একটি পুরো প্রজন্মকে শিখিয়েছে—বাঁচতে হলে চুপ থাকো।

৭. ইউনুসের “দানব হয়ে ওঠা”: ক্ষমতার নেশা ও আত্মমোহ

ইউনুস ব্যক্তিগতভাবে হয়তো নিজেকে দানব মনে করেন না। কিন্তু ইতিহাস ব্যক্তি নয়, ফলাফল দেখে বিচার করে। আর ফলাফল ভয়াবহ।

একজন মানুষ যখন নিজেকে রাষ্ট্রের চেয়েও নৈতিক মনে করে, তখন সে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ইউনুস সেই জায়গায় পৌঁছেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন—তিনি যা করছেন, তা “ভবিষ্যতের জন্য”। এই বিশ্বাসই তাকে দিনের পর দিন আরও কঠোর, আরও বিচ্ছিন্ন, আরও বাস্তবতাবিচ্ছিন্ন করে তুলছে।

দানব সবসময় রক্তমাখা হাতে আসে না। কখনো কখনো দানব আসে হাসিমুখে।

৮. ভবিষ্যৎ: এই পথে গেলে কী হবে?

এই শাসন চলতে থাকলে বাংলাদেশ হবে—

  • একটি ভয়ভিত্তিক রাষ্ট্র
  • একটি অকার্যকর প্রশাসন
  • একটি মৌলবাদ-সহনশীল সমাজ
  • একটি গণতন্ত্রবিহীন কাঠামো

এখানে উন্নয়ন থাকবে না, কারণ বিনিয়োগ ভয় পায়। শিক্ষা থাকবে না, কারণ প্রশ্ন নিষিদ্ধ। সংস্কৃতি থাকবে না, কারণ ভিন্নতা বিপজ্জনক।

শেষ কথা

ইউনুসের শাসন কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি পছন্দ। রাষ্ট্র এই শাসন বেছে নিয়েছে জবাবদিহির বদলে নৈতিকতার গল্প, সাহসের বদলে নীরবতা, গণতন্ত্রের বদলে নিয়ন্ত্রণ।

এই শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলা আজ আর রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়—এটি নাগরিক দায়িত্ব।

কারণ ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—
তখন তুমি কোথায় ছিলে, যখন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে দানবে পরিণত হচ্ছিল?

মুহাম্মদ ইউনুসের শাসনামল: আইনশৃঙ্খলার ধ্বংস, রাষ্ট্রীয় ভীরুতা এবং একটি দেশের পরিকল্পিত

লিখেছেন-আহসানুল কবীর

বাংলাদেশ আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আর ভদ্র ভাষা চলে না। এখানে আর “ট্রানজিশন”, “সংস্কার”, “ভালো উদ্দেশ্য” এই শব্দগুলোর আড়ালে সত্য লুকানো যায় না। মুহাম্মদ ইউনুসের শাসনামল বাংলাদেশকে যে বাস্তবতায় এনে দাঁড় করিয়েছে, তা এক কথায় বলা যায়—রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি জীবন্ত উদাহরণ। এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, এটি ধারাবাহিক অবহেলা, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং নেতৃত্বের চরম অযোগ্যতার ফল।

এই শাসন একটি দেশকে বন্দুকের মুখে নয়, বরং নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতার মাধ্যমে ধ্বংস করছে। ইতিহাসে এই ধরনের শাসন সবচেয়ে ভয়ংকর, কারণ এখানে অত্যাচার চিৎকার করে আসে না—এটি আসে আস্তে, নিঃশব্দে, কিন্তু গভীরভাবে।

১. আইনশৃঙ্খলার ভাঙন: রাষ্ট্র যখন নিজ দায়িত্ব ত্যাগ করে

একটি রাষ্ট্রের প্রথম ও মৌলিক দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইউনুসের শাসনে এই দায়িত্ব কার্যত পরিত্যক্ত। বাংলাদেশ আজ এমন একটি দেশে পরিণত হয়েছে, যেখানে—

  • মব জাস্টিস নিয়মিত ঘটনা
  • ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীন
  • রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানুষ হয়রানির শিকার
  • মতপ্রকাশ করলেই হুমকি

এবং সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই সবকিছু ঘটছে প্রায় কোনো পরিণতি ছাড়াই

পুলিশ প্রশাসন যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো। তারা ঘটনা দেখে, রিপোর্ট লেখে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না। কেন নেয় না? কারণ তারা জানে—উপর থেকে স্পষ্ট রাজনৈতিক নির্দেশ নেই। ইউনুসের শাসনে “নিরপেক্ষতা” মানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া।

এই নিরপেক্ষতা আসলে অপরাধের প্রতি পক্ষপাত।

২. প্রশাসনের ভীতি: সিদ্ধান্তহীনতা একটি নীতিতে পরিণত

ইউনুসের শাসনে প্রশাসন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ এখানে ক্ষমতা আছে, কিন্তু দিকনির্দেশ নেই। আমলারা জানে না—

  • কোন সিদ্ধান্ত নিলে কাল টার্গেট হবে
  • কোন পদক্ষেপকে পরে “অতিরিক্ত” বলা হবে
  • কোন মামলাকে স্পর্শ করাই বিপজ্জনক

ফলে তারা নিরাপদ পথ বেছে নেয়—কিছুই না করা।

এই “কিছুই না করা” এখন প্রশাসনিক সংস্কৃতি। ফাইল ঘোরে, সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে, তদন্ত থেমে যায়। অপরাধীরা বোঝে—এই রাষ্ট্রে সময় নষ্ট করলেই বাঁচা যায়।

৩. মৌলবাদী সহিংসতার স্বর্ণযুগ: নীরবতার লাইসেন্স

ইউনুসের শাসনে সবচেয়ে লাভবান যে শক্তি, তা হলো উগ্র ইসলামবাদী গোষ্ঠী। রাষ্ট্র সরাসরি তাদের সমর্থন দেয় না—এ কথা সত্য। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের থামায়ও না। এই না-থামানোই সবচেয়ে বড় সমর্থন।

যখন সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন লাগে, রাষ্ট্র দ্ব্যর্থক বিবৃতি দেয়।
যখন ব্লাসফেমির অভিযোগে মানুষ হুমকির মুখে পড়ে, রাষ্ট্র বলে “সংবেদনশীলতা”।
যখন নারীর স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, রাষ্ট্র চুপ থাকে।

এই চুপ থাকাই মৌলবাদীদের বলে—“তোমরা এগিয়ে যাও।”

ইউনুসের শাসনে রাষ্ট্র কার্যত একটি মৌলবাদ-সহনশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

৪. ভয়ের রাজনীতি: আত্মনিয়ন্ত্রণই নতুন আইন

আজ বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী আইন হলো ভয়। লিখিত নয়, ঘোষিত নয়—কিন্তু সর্বত্র কার্যকর।

মানুষ এখন আর আইন দেখে না; মানুষ দেখে—“এটা বললে ঝামেলা হবে কি না।”
সাংবাদিক জানে—কিছু বিষয় এড়িয়ে যাওয়াই নিরাপদ।
শিক্ষক জানে—কিছু আলোচনা না করাই ভালো।
নাগরিক জানে—নিজের পরিচয় লুকানোই বুদ্ধিমানের।

এই আত্মনিয়ন্ত্রণই ইউনুসের শাসনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ যেখানে মানুষ নিজেই নিজেকে সেন্সর করে, সেখানে আর রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হয় না।

৫. নৈতিকতার অপব্যবহার: ভালো মানুষের স্বৈরতন্ত্র

ইউনুসের শাসনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—তিনি নিজেকে “নৈতিক উচ্চতায়” স্থাপন করেছেন। এই উচ্চতা থেকে তিনি রাজনীতিকে তুচ্ছ করেন, বিরোধিতাকে অশুদ্ধ বলেন, প্রশ্নকে অশালীন ভাবেন।

এই মনোভাবই স্বৈরতন্ত্রের বীজ।

যখন একজন শাসক মনে করেন, তিনিই নৈতিকতার একমাত্র ধারক, তখন তিনি অন্য সব মতকে অপ্রয়োজনীয় বলে বাতিল করেন। ইউনুসের শাসনে তাই দেখা যায়—

  • ভিন্নমত মানেই সমস্যা
  • সমালোচনা মানেই অস্থিরতা
  • প্রতিবাদ মানেই “দায়িত্বজ্ঞানহীনতা”

এই নৈতিক স্বৈরতন্ত্র গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।

৬. আন্তর্জাতিক মুখোশ, দেশীয় বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইউনুস এখনও “ভদ্রলোক”। বক্তৃতা দেন, নোবেল পরিচয় ঝুলিয়ে রাখেন, সংস্কারের গল্প বলেন। কিন্তু দেশের ভেতরে বাস্তবতা ভিন্ন।

একটি রাষ্ট্র কেবল আন্তর্জাতিক প্রশংসায় চলে না। রাষ্ট্র চলে নাগরিকের নিরাপত্তায়, আইনের শাসনে, ন্যায়বিচারে। এই তিনটি ক্ষেত্রেই ইউনুসের শাসন ব্যর্থ।

এই দ্বিচারিতা একসময় ভেঙে পড়বেই।

৭. রাজনৈতিক দায়িত্বহীনতা: ইতিহাসের কাঠগড়ায় ইউনুস

ইতিহাস ব্যক্তির উদ্দেশ্য দেখে না; ইতিহাস ফলাফল দেখে। ইউনুস হয়তো বিশ্বাস করেন তিনি “ভালো” করছেন। কিন্তু ইতিহাস জিজ্ঞেস করবে—

  • কেন আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ল?
  • কেন মৌলবাদ মাথাচাড়া দিল?
  • কেন মানুষ কথা বলতে ভয় পেল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে ইউনুসকেই।

৮. সামনে কী আছে?

এই শাসন চলতে থাকলে বাংলাদেশ হবে—

  • একটি ভীত রাষ্ট্র
  • একটি অকার্যকর প্রশাসন
  • একটি মৌলবাদ-সহনশীল সমাজ
  • একটি গণতন্ত্রহীন কাঠামো

এটি কোনো অনুমান নয়; এটি ইতিহাসের পরীক্ষিত পথ।

শেষ কথা

মুহাম্মদ ইউনুসের শাসন কোনো “অস্থায়ী অসুবিধা” নয়। এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ভুল। একটি দেশ কোনোদিন নৈতিক বক্তৃতায় চলে না; দেশ চলে সাহসী সিদ্ধান্তে।

এই শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলা আজ আর চরমপন্থা নয়—এটি বাস্তববাদ।

কারণ রাষ্ট্র যদি নিজ দায়িত্ব ভুলে যায়, তবে নাগরিকের চুপ থাকা সবচেয়ে বড় অপরাধ।

নীরবতা যখন অপরাধ: ইউনুস প্রশাসনের সময় ইসলামী মৌলবাদের উত্থান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট

ইশরাত রশিদ, সম্পাদক, ডেইলী নবযুগ

ইতিহাসে কিছু সময় আসে, যখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অপরাধ হয় নীরব থাকা। ইউনুস প্রশাসনের সময় ইসলামী মৌলবাদের উত্থানকে অনেক বিশ্লেষক ঠিক এই নীরবতার ফল হিসেবেই দেখেন। এখানে সরাসরি সহযোগিতার অভিযোগ নয়; অভিযোগ হলো—সময়মতো প্রতিরোধ না করার।

ইসলামী মৌলবাদ বাংলাদেশে হঠাৎ জন্ম নেয়নি। কিন্তু ইউনুস প্রশাসনের সময় এটি যে পরিমাণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জায়গা দখল করতে পেরেছে, তা আগের অনেক সময়ের তুলনায় বেশি। এর কারণ মৌলবাদ শক্তিশালী হয়ে গেছে—এমন নয়; বরং রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে গেছে।

এই দুর্বলতার মূল ছিল নীতিগত দ্ব্যর্থকতা। প্রশাসন একদিকে বলেছে তারা মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিতে বিশ্বাসী, অন্যদিকে মৌলবাদী চাপের মুখে কঠোর অবস্থান নেয়নি। এই দ্বিচারিতা মৌলবাদীদের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। তারা বুঝেছে—রাষ্ট্র কথা বলে, কিন্তু কাজ করে না।

এই সময়ে ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠীগুলো সামাজিক পরিসরে এক ধরনের নৈতিক পুলিশিং শুরু করে। কে কী বলবে, কী পড়বে, কী দেখবে—এসব নিয়ে হুমকি ও চাপ তৈরি হয়। রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল ধীর ও অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতাই মৌলবাদকে শক্তিশালী করেছে।

সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—এই মৌলবাদ এখন আর শুধু সহিংসতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি চিন্তার জগৎ দখল করছে। তরুণদের বলা হচ্ছে—তাদের হতাশার কারণ আধুনিকতা, নারীর স্বাধীনতা, ভিন্ন পরিচয়। এই সরল ব্যাখ্যা তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, কারণ রাষ্ট্র তাদের জটিল বাস্তব সমস্যার কোনো সমাধান দিতে পারেনি।

ইউনুস প্রশাসনের সময় তরুণদের জন্য কোনো শক্তিশালী, প্রগতিশীল পাল্টা বয়ান গড়ে ওঠেনি। ফলে মৌলবাদ একচেটিয়া জায়গা করে নেয়। এটি শুধু আদর্শিক ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।

এই মৌলবাদী উত্থানের দীর্ঘমেয়াদি ফল ভয়াবহ। এটি বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে একটি ভয়ভিত্তিক সমাজে, যেখানে ভিন্নতা অপরাধ, প্রশ্ন করা বিপজ্জনক, আর নীরব থাকাই বাঁচার কৌশল। এই সমাজে অর্থনীতি, শিক্ষা বা উন্নয়ন—কিছুই টেকসই হয় না।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—এই ধ্বংস ধীরে ধীরে হচ্ছে। তাই অনেকে এখনো বিপদের গভীরতা বুঝতে পারছে না। কিন্তু ইতিহাস বলে, ধীর ধ্বংসই সবচেয়ে নিশ্চিত ধ্বংস।

এই দুটি ব্লগের শেষ কথা একটাই:
বাংলাদেশ এখনো শেষ হয়ে যায়নি, কিন্তু শেষের দিকে হাঁটছে। এই হাঁটা থামাতে হলে নীরবতা ভাঙতে হবে, মৌলবাদকে নাম ধরে ডাকতে হবে, আর রাষ্ট্রকে আবার শক্ত হতে হবে।

না হলে ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না।