BangladeshOpinion

ইউনুস আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা, মামলা, অপমান: রাষ্ট্র যখন নিজের ইতিহাসকে আদালতে তোলে

এম ডি সামিউল আলম | যুক্তরাজ্য থেকে

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি অতীত নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। যারা যুদ্ধ করেছে, যারা জীবন দিয়েছে, যারা নির্যাতন সয়েছে—তারা রাষ্ট্রের কাছে শুধু “সম্মানের দাবিদার” নয়; তারা রাষ্ট্রকে বৈধতা দিয়েছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ, অপমান, হয়রানি—এগুলো নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এগুলো রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের লক্ষণ

ইউনুস সরকারের সময়কালে যে ঘটনাগুলো সামনে এসেছে—বিশেষ করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে—তাতে দেখা যাচ্ছে মব সহিংসতা বৃদ্ধি, জনসমক্ষে অপমানের সংস্কৃতি, এবং “টার্গেটেড হিউমিলিয়েশন” নতুনভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারাও পড়েছেন।

১) মব সহিংসতার ঢেউ: রাষ্ট্র যখন “দর্শক” হয়ে যায়

এনজিও ও মানবাধিকার সংগঠন Ain o Salish Kendra (ASK)-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মব ভায়োলেন্সে নিহত হয়েছেন—এমন রিপোর্ট সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মব সহিংসতা মানে এক ধরনের সামাজিক “অলিখিত শাসন” তৈরি হওয়া—যেখানে আদালত নয়, রাস্তাই বিচার করে। এই বাস্তবতায় মুক্তিযোদ্ধাদের মতো প্রতীকী জনগোষ্ঠী যখন অপমানিত হয়, সেটা ইঙ্গিত করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ শুধু দুর্বল নয়—অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।

২) মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান: ঘটনা না প্রবণতা?

ডেইলি স্টার রিপোর্ট করেছে যে ASK “freedom fighters… humiliated, assaulted and publicly abused” ধরনের ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে। এটা কোনো ছোট বাক্য নয়। “Humiliated” শব্দটি এখানে সাংবিধানিক মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা দেওয়ার মতো ঘটনা, জনসমক্ষে হেনস্তা—এগুলো রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জার বিষয়।

এখানে প্রশ্ন ওঠে: রাষ্ট্র কেন কঠোরভাবে থামাতে পারছে না?
উত্তর সহজ: যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা অস্থির, প্রশাসনিক নেতৃত্ব দ্বিধাগ্রস্ত, এবং মাঠ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল—তখন মব সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়।

৩) মামলা ও হয়রানি: ইতিহাসের বিরুদ্ধে “আইনি যুদ্ধ”

বাংলাদেশে রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় প্রায়শই দেখা যায়—পুরনো শিবিরের সঙ্গে যুক্ত বা প্রতীকী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা-হয়রানির ঢেউ নামে। Amnesty UK পর্যন্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রসিকিউশনের একটি উদ্বেগজনক ধারার কথা উল্লেখ করেছে। এ ধরনের পরিবেশে মুক্তিযোদ্ধারা দ্বিমুখী চাপের মধ্যে পড়েন:

  • একদিকে সামাজিক/মব অপমান
  • অন্যদিকে মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতা

এটা শুধু ব্যক্তি-দুর্ভোগ নয়; এটা রাষ্ট্রের স্মৃতি-ব্যবস্থার ওপর আঘাত। কারণ যখন রাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধাকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, তখন সে কার্যত বলে দেয়—রাষ্ট্র তার নিজের ভিত্তিকে রক্ষা করতে অপারগ।

৪) রাষ্ট্রীয় নীরবতা: সবচেয়ে ভয়ংকর রাজনৈতিক অবস্থান

এই সবকিছুর ভেতরে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো রাষ্ট্রের ভাষা—যেখানে দায় অস্বীকার, ঘটনা “বিচ্ছিন্ন” বলে চালানো, কিংবা উভয় পক্ষকে সমান করে দেখা হয়।
কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান “বিচ্ছিন্ন” হতে পারে না। কারণ প্রতীকী আঘাত বিচ্ছিন্ন থাকে না; এটি একটি বার্তা দেয়। আর বার্তাটি হলো:
“যার শক্তি আছে, সে রাস্তায় শাসন করতে পারে।”

৫) উপসংহার: মুক্তিযুদ্ধকে নিষ্ক্রিয় প্রতীক বানালে বাংলাদেশ শুধু রাষ্ট্র থাকবে, দেশ থাকবে না

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশ্নে কড়া অবস্থান নেওয়া মানে কাউকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়া নয়; এটা রাষ্ট্রকে বাঁচানোর মৌলিক কাজ।
যদি রাষ্ট্র এই অপমান, হামলা, মব সংস্কৃতি থামাতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ হবে খুব নির্দয়:

  • ইতিহাস থাকবে পাঠ্যবইয়ে
  • নিরাপত্তা থাকবে ক্ষমতার কাছে
  • এবং “রাষ্ট্র” থাকবে, কিন্তু “ন্যায়” থাকবে না